মণিপুরী বৃহত্তর সিলেটের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী
— প্রিপারেশন
প্রাচীনকালে মণিপুরী নৃগোষ্ঠী ক্যাংলেইপাক (Kangleipak), ক্যাংলেইপাং (Kangkleipung), ক্যাংলেই (Kanglei), মেইত্রাবাক (Meitrabak), মেখালি (Mekhali) প্রভৃতি নামে পরিচিত ছিল। মণিপুরীদের মেইতেই নামেও অভিহিত করা হতো। মহারাজ গরীব নিওয়াজের (১৭০৯-১৭৪৮) শাসনামলে সিলেট থেকে আগত মিশনারিগণ এই স্থানকে মহাভারতে বর্ণিত একটি স্থান মনে করে এই ভূখণ্ডের নাম দেন মণিপুর। এভাবেই এখানকার প্রধান অধিবাসী মেইতেইদের নাম হয়ে যায় মণিপুরী। জাতিগত দিক থেকে মণিপুরীরা মঙ্গোলীয় মানবগোষ্ঠীর তিব্বতি-বর্মি পরিবারের কুকি-চীন গোত্রভুক্ত।
গোড়াপত্তন
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে মণিপুরী নৃগোষ্ঠীর আদি বাসস্থান। মণিপুরের প্রাচীন নাম ছিল গন্ধর্বরাজ্য; আবার কখনও পার্বত্যরাজ্য: আসামের প্রাচীন দলিলদস্তাবেজে এদেশের প্রাচীন আখ্যা 'মুঘলই' বা 'মুঘলু' নামে কথিত। মহাভারতে উল্লেখ আছে, একদা এ অঞ্চলের নাম ছিল মেকলি দেশ এবং পরবর্তীতে 'মণিপুর'। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মণিপুর রাজ্যের অধিবাসীরা দেশত্যাগ করে ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আশ্রয় গ্রহণ করে। তবে মণিপুর-বার্মা যুদ্ধের সময় অভিবাসন ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়। এ সময় মণিপুর পরাধীন হয়ে পড়ে এবং বর্মি দখলদারগণ প্রায় ৭ বছর দেশটি শাসন করে। উক্ত সময়ে মণিপুররাজ চৌরাজিত সিংহ তার দুই ভ্রাতা মার্জিত সিংহ ও গাম্ভির সিংহসহ সিলেটে আশ্রয় নেন। তারা সিলেটের মীর্জাজাঙ্গালে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা, ময়মনসিংহের দুর্গাপুর এবং ঢাকার তেজগাঁও এলাকায় মণিপুরী বসতিগুলো সে সময়ই গড়ে ওঠে। বর্তমানে মণিপুরীরা প্রধানত বৃহত্তর সিলেটে বসবাস করছে।
ধর্ম
মণিপুরীদের ধর্ম হচ্ছে 'বৈষ্ণবধর্ম'। অবশ্য সুদূর অতীতে মণিপুর অঞ্চলে এক প্রকার বার্ত্যধর্ম তথা প্রকৃতির পূজারীতি প্রচলিত ছিল। তবে তারা সনাতন রীতিতে গন্ধর্ব ধারায় চিরাচরিতভাবে পরম বিষ্ণু দেবতার প্রতি অবিচল। এছাড়া অনেক মণিপুরী রয়েছে যারা ইসলাম ধর্ম পালন করে। তবে অষ্টাদশ শতাব্দীতে সনাতন ধর্মগ্রহণের পূর্বে মণিপুরীরা অপম্পা (Apokpa) ধর্মচর্চা করত। মণিপুরীরা একদিকে জাঁকজমকভাবে সনাতন ধর্মের বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদি, যেমন রথযাত্রা, রাসপূর্ণিমা, ঝুলনযাত্রা ইত্যাদি পালন করে, একইসঙ্গে তারা পূর্বের ধর্মীয় অনুষ্ঠান লাইহারাওবা (Laiharaoba), সাজিবু চেইরাওবা (Sajibu Chairaoba) ইত্যাদিও পালন করে থাকে। তারা সানামাহি (Sanamahi), পাকাংবা (Pakangba) এবং লেইমারেন (Leimaren) প্রভৃতি গৃহ দেবদেবীর পূজাও করে থাকে।
রাস উৎসব
বৃহত্তর সিলেটের মণিপুরী সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব 'রাসপূর্ণিমা' বা 'রাস উৎসব'। প্রতি বছর কার্তিক মাসের পূর্ণিমা তিথিতে পালিত হয় রাস উৎসব। রাস উৎসবের দুটি পর্ব। দিনের বেলায় রাখালরাস আর রাতে মহারাস। মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জে মাধবপুরের শিববাজারে (জোড়ামণ্ডপে) মণিপুরিদের রাস উৎসব উদ্যাপিত হয়ে আসছে।
মুসলিম নৃ-গোষ্ঠী: পাঙন
ভাষাগত এবং ধর্মীয় ভিন্নতার কারণে বাংলাদেশের মণিপুরীরা তিনটি শাখায় বিভক্ত এবং স্থানীয়ভাবে তারা বিষ্ণুপ্রিয়া, মৈতৈ ও পাঙন নামে পরিচিত। মণিপুরীদের মধ্যে ইসলাম ধর্মের অনুসারী সম্প্রদায়টি 'পাঙন' বা 'পাঙ্গান' বা 'পাঙ্গাল' বা মণিপুরী মুসলিম হিসেবে পরিচিত। ১৭ শতকের প্রথম দিকে মুসলিম সৈন্যরা বন্দুক প্রস্তুতকারক হিসেবে বা লবণ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে মণিপুর প্রবেশ করেন। ঘটনাক্রমে তারা একটি চুক্তির মাধ্যমে মণিপুরে থেকে যান। ১৭১৭ সালে বার্মার (বর্তমান মিয়ানমার) সাথে যুদ্ধ বাঁধলে মণিপুরের রাজা গরীব নিওয়াজ (Gharib Niwaz) মৈতৈ বাহিনীর পক্ষে মুসলিম সৈন্যদের সাহায্য চান। যুদ্ধে তারা বীরত্বের পরিচয় দেন। মৈতৈ বাহিনী জয়লাভ করে। রাজা খুশি হয়ে তাদের 'পাঙ্গাল' উপাধি দেন। মৈতৈ ভাষায় পাঙ্গাল মানে শক্তি বা শক্তিশালী। কালক্রমে তাদের বংশধররা পাঙ্গাল বা পাঙন বা মণিপুরী মুসলিম নামে পরিচিতি পায়। বাংলাদেশের সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ জেলার নানান স্থানে মণিপুরী মুসলিমরা বাস করে। পাঙনরা সুন্নি মুসলিম। পাঙাল সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী নৃত্যকে থাবল চোংবা বলে। ঈদ পাঙনদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব।
জনসংখ্যা
২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী মণিপুরীদের মোট জনসংখ্যা ২২,৯৭৯ জন।
FACT FILE
- ইংরেজি নাম: Manipuri
- বসবাসে শীর্ষ উপজেলা: কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার)
- বসবাসে শীর্ষ জেলা: মৌলভীবাজার
- ভাষা: বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ও মৈথৈ
- ধর্ম: বৈষ্ণব ও ইসলাম
- পরিবার: পিতৃতান্ত্রিক
- জনসংখ্যা: ২২,৯৭৯
- বর্ষবরণ অনুষ্ঠান: বিষু বা চেরৌ ও চৈরাউবা কুম্মে কলাবতী শাড়ি উদ্ভাবন করেন রাধাবতী দেবী।
ভাষা ও সাহিত্য
মণিপুরীদের মধ্যে দুটি ভিন্ন ভাষা প্রচলিত রয়েছে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষা (বিষ্ণুমঠা) ও মৈতৈ মণিপুরী ভাষা (মৈতৈলোকেই)। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের মাঝে প্রচলিত ভাষার সংক্ষিপ্ত নাম হলো 'বিষ্ণুষ্ঠার'। এ ভাষার স্বরূপগত উৎপত্তির মূলে রয়েছে মাগধীয় প্রাকৃত। যদিও বাংলা-অসমীয়ার সঙ্গে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার ক্ষেত্রগত কিছু মিল পরিলক্ষিত হয়, তথাপি এর নিজস্ব ধ্বনিগত ও রূপগত কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীরা তাদের নিজভাষাকে 'ইমারঠার' নামে আখ্যায়িত করেন। যার অর্থ ৩ মাতৃভাষা। কার্যত Languistic Commissioner of India 8 স্বয়ং তদন্ত সাপেক্ষে Registrar General, Govemment of India, no-27,78 cd (c.e.n.) New Delhi, Dated 26th June 1980-এর আদেশ অনুযায়ী, বিষ্ণুপ্রিয়াদের ভাষার নাম হলো 'বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী'। মণিপুরী ভাষা আজ শুধু মণিপুরের রাষ্ট্রভাষাই নয়, এটি ভারতের সংবিধানে ৮ম তফসিলে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে দেশটির জাতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। মহাভারত, রামায়ণের মতো মহাকাব্য এবং ধর্মীয় গ্রন্থ শ্রীমদ্ভাগবদগীতা, বাইবেল প্রভৃতি মণিপুরী ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
মণিপুরী ললিতকলা একাডেমি
মণিপুরী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যমন্ডিত সাংস্কৃতিক উপাদানকে সংরক্ষণ ও পুনর্জাগরণ করার জন্য ১৯৭৭ সালে মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নের শিববাজারে মণিপুরী ললিতকলা তকলা একাডেমি একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১০ সালে মণিপুণি ললিতকলা একাডেমি একটি পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসিত সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাজস্বখাতে অন্তর্ভুক্ত হয়।
মণিপুরী জাদুঘর
মণিপুরী জাদুঘর মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের ছনগাঁও গ্রামে অবস্থিত। ১ অক্টোবর ২০০৬ মণিপুরী বাসিন্দা হামোম তনুবাবু এই জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেন। মণিপুরী জাদুঘরের পোশাকি নাম 'চাউবা মেমোরিয়াল মণিপুরি ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি মিউজিয়াম'।
মণিপুরী শাড়ি
সিলেটি মণিপুরী তাঁতশিল্পের ঐতিহ্য অনেক প্রাচীন। এটি ৩০০ বছরের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি। ধারণা করা হয় মণিপুরি নারী তাঁতিরা মণিপুরী 'ইন্নাফ' (ওড়না) থেকে ১২ হাতের শাড়ি বোনা শুরু করেন। সিলেটের মণিপুরী শাড়ি দেশের ৩৭তম নিবন্ধিত ভৌগোলিক নির্দেশক (GI) পণ্য।
মণিপুরী নৃত্য
উপমহাদেশের শাস্ত্রীয় নৃত্যের অন্যতম একটি শাখা মণিপুরী নৃত্য। সুপ্রাচীন নৃত্যধারা হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে। ভারতের মণিপুর থেকে মূলত মণিপুরী নৃত্যের উৎপত্তি। এই নৃত্যকে বহির্বিশ্বে পরিচিত করেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি প্রথম সিলেটে এবং ত্রিপুরাতে এই নত্য অনুষ্ঠান দেখে মণিপুরী নৃত্যের প্রতি মুগ্ধ ও আকৃষ্ট হন। এরপর তিনি আগরতলা থেকে মণিপুরী নৃত্য শিক্ষক এনে এবং পরবর্তীকালে মণিপুর থেকে নৃত্য শিক্ষক এনে শান্তিনিকেতনে মণিপুরী নৃত্য শিক্ষার ব্যবস্থা শুরু করেন।
