দায়মুক্তি কী এবং কেন?

প্রিপারেশন

৯ ঘণ্টা আগে

আমরা প্রায়ই খবরে শুনি যে কোনো কর্মকর্তাকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। অথবা দেখি যে কোনো চুক্তিপত্রে দায়মুক্তি ধারা যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু আসলে দায়মুক্তি জিনিসটা কী? এটা কেন দরকার হয়? আর কখন এটা ভালো, কখন খারাপ? চলুন এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজি সহজ ভাষায়।

দায়মুক্তির মূল ধারণা

দায়মুক্তি মানে হলো কোনো কাজ বা সিদ্ধান্তের জন্য দায়দায়িত্ব থেকে মুক্ত হওয়া। ইংরেজিতে একে বলে Indemnity বা Immunity। ধরুন, আপনি একটা কাজ করলেন। স্বাভাবিকভাবে সেই কাজের ফলাফলের জন্য আপনাকেই জবাবদিহি করতে হবে। কিন্তু যদি আপনাকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়, তাহলে সেই কাজের জন্য আপনার বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না।

শুনতে একটু অদ্ভুত লাগছে, তাই না? কেউ যদি কিছু ভুল করে, তাহলে তাকে জবাবদিহি করতে হবে এটাই তো স্বাভািক। তাহলে দায়মুক্তি কেন দরকার?

আসলে দায়মুক্তির পেছনে বেশ কিছু যুক্তি আছে। কিছু কিছু পেশায়, কিছু কিছু পরিস্থিতিতে মানুষকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয় যেখানে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যদি প্রতিটি ভুলের জন্য শাস্তির ভয় থাকে, তাহলে মানুষ সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পাবে। আর কাজই হবে না।

কোথায় কোথায় দায়মুক্তি দেখা যায়?

সরকারি কর্মকর্তাদের দায়মুক্তি

বাংলাদেশে আমরা প্রায়ই দেখি সরকারি কর্মকর্তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়। বিশেষ করে প্রশাসনিক কর্মকর্তা, পুলিশ, সেনাবাহিনী, আমলাদের ক্ষেত্রে এটা বেশি দেখা যায়। কেন?

একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা প্রতিদিন শত শত সিদ্ধান্ত নেন। একটা প্রকল্প অনুমোদন করা, একটা লাইসেন্স দেওয়া, একটা জমি অধিগ্রহণ করা। প্রতিটি সিদ্ধান্তে কারো না কারো স্বার্থ জড়িত থাকে। যদি প্রতিটি সিদ্ধান্তের জন্য তাকে আদালতে টানা যায়, তাহলে তিনি কাজই করতে পারবেন না। সারাদিন মামলা সামলাতেই কেটে যাবে।

তাই সৎ নিয়তে নেওয়া সিদ্ধান্তের জন্য কর্মকর্তাদের সুরক্ষা দেওয়া হয়। এতে তারা নিঃসংকোচে কাজ করতে পারেন। কিন্তু এখানে একটা বড় শর্ত আছে। সিদ্ধান্তটি হতে হবে সৎ নিয়তে, আইনের মধ্যে থেকে এবং নিজের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে।

চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে দায়মুক্তি

একজন ডাক্তার অপারেশন থিয়েটারে একটা জটিল অপারেশন করছেন। হাজারো সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে প্রতি মিনিটে। রোগীর জীবন তার হাতে। এই পরিস্থিতিতে যদি প্রতিটি সিদ্ধান্তের জন্য মামলার ভয় থাকে, তাহলে ডাক্তার ঝুঁকি নিতে পারবেন না। জটিল কেস নিতে চাইবেন না।

তাই চিকিৎসা আইনে একটা ধারণা আছে যেটাকে বলে 'ক্লিনিক্যাল জাজমেন্ট'। যদি একজন ডাক্তার তার যোগ্যতা অনুযায়ী, প্রচলিত চিকিৎসা নীতি মেনে সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে ফলাফল যাই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে সহজে মামলা করা যায় না।

অবশ্য এর মানে এই নয় যে ডাক্তাররা যা খুশি তাই করতে পারবেন। অবহেলা বা দায়িত্বহীনতা প্রমাণিত হলে তাদেরও শাস্তি হয়। কিন্তু সৎ চেষ্টা করে নেওয়া সিদ্ধান্তের জন্য তাদের সুরক্ষা আছে।

বিচারকদের দায়মুক্তি

বিচারকরা প্রতিদিন কঠিন সিদ্ধান্ত নেন। একটা রায় একজন মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। যদি বিচারকদের প্রতিটি রায়ের জন্য মামলা করা যায়, তাহলে বিচার ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।

তাই বিশ্বের প্রায় সব দেশেই বিচারকদের 'জুডিশিয়াল ইমিউনিটি' দেওয়া হয়। আদালতে দেওয়া রায়ের জন্য বিচারকের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত মামলা করা যায় না। তবে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা যায়, সেটা আলাদা বিষয়।

সাংবাদিকদের সীমিত দায়মুক্তি

সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য সাংবাদিকদেরও একধরনের সুরক্ষা দরকার। তারা যদি প্রতিটি প্রতিবেদনের জন্য মামলার ভয়ে থাকেন, তাহলে দুর্নীতি বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখতে পারবেন না।

তাই অনেক দেশে সাংবাদিকদের জন্য 'কোয়ালিফাইড প্রিভিলেজ' আছে। যদি কোনো সংবাদ জনস্বার্থে প্রকাশিত হয়, এবং সেটা যাচাই করার যুক্তিসঙ্গত চেষ্টা করা হয়েছে, তাহলে সেটার জন্য সহজে মানহানির মামলা করা যায় না।

ব্যবসায়িক চুক্তিতে দায়মুক্তি

যখন দুটো প্রতিষ্ঠান চুক্তি করে, তখন প্রায়ই দায়মুক্তি ধারা যুক্ত করা হয়। ধরুন, একটা সফটওয়্যার কোম্পানি আপনাকে একটা প্রোগ্রাম বিক্রি করলো। চুক্তিতে লেখা থাকতে পারে যে সফটওয়্যারে কোনো বাগ থাকলে তারা ঠিক করে দেবে, কিন্তু আপনার ব্যবসার ক্ষতি হলে তার দায় তারা নেবে না।

এটা অন্যায় মনে হতে পারে। কিন্তু ভেবে দেখুন, একটা ১০ হাজার টাকার সফটওয়্যার বিক্রি করে কোম্পানি ১০ লাখ টাকার ক্ষতির দায় নিতে পারে না। তাহলে তো ব্যবসাই করা যাবে না।

তাই ব্যবসায়িক জগতে সীমিত দায়বদ্ধতা স্বীকৃত। তবে এখানেও একটা ব্যালান্স দরকার। ভোক্তা সুরক্ষা আইন দেখে যে কোম্পানিগুলো অন্যায্যভাবে দায় এড়াতে না পারে।

দায়মুক্তি কেন দরকার?

১. সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস

কল্পনা করুন একজন পুলিশ কর্মকর্তা একটা দাঙ্গার পরিস্থিতি সামলাচ্ছেন। তাকে মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বলপ্রয়োগ করবেন কিনা, কতটুকু করবেন। যদি প্রতিটি সিদ্ধান্তের জন্য পরে মামলা হবে ভেবে তিনি ভয় পান, তাহলে তিনি সময়মতো পদক্ষেপ নিতে পারবেন না।

দায়মুক্তি দেওয়ার অর্থ হলো তাকে বলা যে তুমি সৎ নিয়তে যা ভালো মনে করো তাই করো। ফলাফলের সম্পূর্ণ দায় তোমার উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে না।

২. পেশাগত স্বাধীনতা

একজন শিক্ষক ক্লাসে কোনো বিতর্কিত বিষয় পড়াচ্ছেন। হয়তো ইতিহাসের একটা জটিল ঘটনা, যেখানে বিভিন্ন মতামত আছে। যদি প্রতিটি বক্তব্যের জন্য তাকে মামলার ভয়ে থাকতে হয়, তাহলে তিনি শুধু নিরাপদ বিষয় পড়াবেন। শিক্ষার উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে।

একইভাবে, একজন গবেষক নতুন কিছু আবিষ্কারের চেষ্টা করছেন। পরীক্ষায় ভুল হতে পারে। যদি প্রতিটি ব্যর্থতার জন্য তাকে শাস্তি দেওয়া হয়, তাহলে কেউ গবেষণা করবে না।

৩. দক্ষতা বৃদ্ধি

যখন মানুষ জানে যে সৎ চেষ্টার জন্য তাদের শাস্তি হবে না, তখন তারা নতুন পদ্ধতি চেষ্টা করে। শেখে। উন্নতি করে। ভুল থেকে শিক্ষা নেয়।

কিন্তু যদি প্রতিটি ভুলের জন্য কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা থাকে, তাহলে সবাই নিরাপদ পথে চলবে। নতুন কিছু করতে চাইবে না। ফলে সামগ্রিক দক্ষতা বাড়বে না।

৪. জবাবদিহিতার ভয় থেকে মুক্তি

এটা শুনতে প্রতিকূল মনে হতে পারে, কিন্তু একটা পর্যায়ে অতিরিক্ত জবাবদিহিতা কাজের ক্ষতি করে। একজন সরকারি কর্মকর্তা যদি জানেন যে পরবর্তী সরকার এসে তার সব সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলবে, তাহলে তিনি কোনো সিদ্ধান্তই নেবেন না। ফাইল এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ঘুরবে।

দায়মুক্তি এই ভয় কমায়। কর্মকর্তা জানেন যে যতক্ষণ তিনি সৎভাবে কাজ করছেন, ততক্ষণ তাকে ভয় পেতে হবে না।

দায়মুক্তির বিপদ

কিন্তু দায়মুক্তি নিয়ে সমস্যাও আছে। আর সেই সমস্যাগুলো অনেক সময় খুবই গুরুতর।

ক্ষমতার অপব্যবহার

দায়মুক্তির সবচেয়ে বড় বিপদ হলো এটা ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে। যখন কেউ জানে যে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তখন সে যা খুশি তাই করতে পারে।

আমরা বাংলাদেশে বহুবার দেখেছি যে দায়মুক্তির আড়ালে দুর্নীতি হয়েছে। ক্ষমতাসীনরা তাদের পছন্দের মানুষদের দায়মুক্তি দিয়েছে, আর তারা নির্বিঘ্নে অপকর্ম করেছে।

ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়া

যখন কোনো ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি দেখে যে যে তার ক্ষতি করেছে তার বিরুদ্ধে কিছু করা যাচ্ছে না, তখন সে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। এটা খুবই হতাশাজনক।

ধরুন, পুলিশের গুলিতে একজন নিরপরাধ মানুষ মারা গেল। পরিবার চায় বিচার। কিন্তু পুলিশকে দায়মুক্তি দেওয়া হলো। পরিবার কী করবে? তাদের কষ্ট, তাদের ক্ষতির কোনো প্রতিকার নেই।

জবাবদিহিতার সংস্কৃতি নষ্ট হওয়া

যখন মানুষ দেখে যে উপরের স্তরের মানুষেরা কোনো দায় নেয় না, তখন নিচের স্তরের মানুষেরাও দায় নিতে চায় না। একটা 'পাস দ্য বাক' সংস্কৃতি তৈরি হয়। কেউ দায়িত্ব নিতে চায় না।

এটা সমাজের জন্য ভয়ানক ক্ষতিকর। জবাবদিহিতা ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান, কোনো সিস্টেম ঠিকভাবে চলতে পারে না।

আস্থার সংকট

যখন সাধারণ মানুষ দেখে যে একই অপরাধের জন্য সাধারণ মানুষের শাস্তি হয়, কিন্তু ক্ষমতাবানদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়, তখন তারা পুরো ব্যবস্থার উপর আস্থা হারায়।

এই আস্থার সংকট খুবই বিপজ্জনক। মানুষ যখন বিশ্বাস করে যে আইন সবার জন্য সমান নয়, তখন তারা আইন মানতে চায় না। সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়।

সঠিক ভারসাম্য কীভাবে রাখা যায়?

দায়মুক্তি একেবারে বাদ দেওয়াও ঠিক নয়, আবার সীমাহীন দায়মুক্তিও বিপজ্জনক। তাহলে সমাধান কী?

স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা

দায়মুক্তি দেওয়া হলেও তার কারণ স্পষ্ট থাকতে হবে। কাকে, কেন দায়মুক্তি দেওয়া হলো, সেটা প্রকাশ্য হতে হবে। গোপনে, রাতের অন্ধকারে দায়মুক্তি দেওয়া চলবে না।

আর দায়মুক্তি দিলেও একটা তদন্ত হতে হবে। ঘটনা কী ঘটেছে, কেন ঘটেছে, সেটা জানা দরকার। এতে ভবিষ্যতে ভুল এড়ানো যাবে।

সীমিত এবং শর্তযুক্ত দায়মুক্তি

দায়মুক্তি হতে হবে সীমিত এবং শর্তযুক্ত। শুধুমাত্র দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে, সৎ নিয়তে করা কাজের জন্য দায়মুক্তি দেওয়া যেতে পারে। ব্যক্তিগত লাভের জন্য, দুর্নীতির জন্য, ইচ্ছাকৃত অপরাধের জন্য দায়মুক্তি দেওয়া যাবে না।

আর দায়মুক্তি পূর্বনির্ধারিত হতে পারে না। মানে, অপরাধ করার আগেই বলা যাবে না যে তোমাকে দায়মুক্তি দেওয়া হবে। প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে।

স্বাধীন তদন্ত

যখন দায়মুক্তি দেওয়া হয়, তখন একটা স্বাধীন সংস্থার তদন্ত করা উচিত। যেমন বাংলাদেশে দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন আছে। এরা স্বাধীনভাবে তদন্ত করবে এবং রিপোর্ট দেবে।

তদন্তের রিপোর্ট প্রকাশ্য হতে হবে। জনগণের জানার অধিকার আছে যে কী হয়েছে।

বিকল্প ক্ষতিপূরণ

যদি কারো ক্ষতি হয়, আর দায়মুক্তির কারণে সরাসরি বিচার না পাওয়া গেলেও, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত। রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠান এই দায়িত্ব নেবে।

এটা সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার না হলেও অন্তত কিছুটা সান্ত্বনা দেয়। মানুষ দেখে যে তাদের কষ্টের স্বীকৃতি আছে।

পর্যায়ক্রমিক পর্যালোচনা

দায়মুক্তি নীতিমালা নিয়মিত পর্যালোচনা করা উচিত। সময়ের সাথে পরিস্থিতি বদলায়। যে নীতি আগে কাজ করতো, সেটা এখন নাও করতে পারে।

আর কোনো বিশেষ ক্ষেত্রে দায়মুক্তির অপব্যবহার বেশি হলে, সেটা সংশোধন করতে হবে।

বাংলাদেশে দায়মুক্তির অবস্থা

বাংলাদেশে দায়মুক্তির ধারণা বেশ জটিল। সংবিধানে বলা আছে যে আইনের চোখে সবাই সমান। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখি যে এই নীতি সবসময় মানা হয় না।

সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা আছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে হলে সরকারের অনুমতি লাগে। এটা একদিকে যুক্তিসঙ্গত, কারণ নয়তো হয়রানিমূলক মামলা হতে পারে। কিন্তু অন্যদিকে এটা অপব্যবহার হয়।

কখনো কখনো রাজনৈতিক কারণে দায়মুক্তি দেওয়া হয়। দলীয় লোকদের রক্ষা করতে। এটা আইনের শাসনের জন্য ক্ষতিকর।

আবার কখনো দেখা যায় যে সত্যিকার অর্থে যারা সৎভাবে কাজ করছেন, তাদেরও হয়রানি করা হয়। পরবর্তী সরকার এসে আগের সরকারের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়।

এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে আমাদের একটা স্থিতিশীল, স্বচ্ছ নীতি দরকার। যেখানে রাজনৈতিক বিবেচনা নয়, আইন এবং ন্যায়বিচার প্রাধান্য পাবে।

আন্তর্জাতিক উদাহরণ

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দায়মুক্তির বিভিন্ন ব্যবস্থা আছে।

যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রপতিকে সীমিত দায়মুক্তি আছে। তবে কোনো অপরাধ করলে অভিশংসন করা যায়। আর পদ ছাড়ার পর তার বিরুদ্ধে মামলা করা যায়।

যুক্তরাজ্যে সংসদ সদস্যদের সংসদে দেওয়া বক্তব্যের জন্য দায়মুক্তি আছে। এতে তারা নির্ভয়ে কথা বলতে পারেন। তবে সংসদের বাইরে তাদের কোনো বিশেষ সুরক্ষা নেই।

জার্মানিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একটা নীতি করা হয়েছে যে যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য কোনো দায়মুক্তি নেই। যতদিন পরেই হোক, অপরাধীকে বিচারের আওতায় আনা হবে।

দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ শেষে একটা 'ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন' করা হয়। যারা তাদের অপরাধ স্বীকার করে সত্য বলতো, তাদের শর্তসাপেক্ষে ক্ষমা দেওয়া হতো। এটা একটা অনন্য উদাহরণ যেখানে ন্যায়বিচারের চেয়ে জাতীয় পুনর্মিলনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

শেষ কথা

দায়মুক্তি একটা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা, কিন্তু এটা অবশ্যই সীমিত এবং নিয়ন্ত্রিত হতে হবে। কিছু কিছু পরিস্থিতিতে মানুষকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস দিতে হয়, তাদের পেশাগত স্বাধীনতা দিতে হয়। কিন্তু সেটা ক্ষমতার অপব্যবহারের লাইসেন্স হতে পারে না।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে দায়মুক্তির উদ্দেশ্য হলো জনস্বার্থ রক্ষা করা। যখন দায়মুক্তি ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার হয়, তখন সেটা বাতিল করতে হবে।

একটা সুস্থ সমাজে দায়মুক্তি এবং জবাবদিহিতার মধ্যে ভারসাম্য থাকে। কর্মকর্তারা নির্ভয়ে কাজ করতে পারেন, কিন্তু জানেন যে অসৎ কাজের জন্য তাদের শাস্তি হবে। সাধারণ মানুষ জানে যে তাদের ক্ষতি হলে তারা প্রতিকার পাবে, কিন্তু তারা কর্মকর্তাদের হয়রানিও করতে পারে না।

এই ভারসাম্য তৈরি করা সহজ নয়। এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া। সমাজ যত উন্নত হবে, মানুষের সচেতনতা যত বাড়বে, এই ভারসাম্য তত ভালো হবে।

আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব হলো এই বিষয়ে সচেতন থাকা। যখন দেখব যে দায়মুক্তির অপব্যবহার হচ্ছে, আমাদের আওয়াজ তুলতে হবে। আবার যখন দেখব যে সৎ কর্মকর্তাদের হয়রানি করা হচ্ছে, তাদের পক্ষেও দাঁড়াতে হবে।

ন্যায়বিচার মানে শুধু শাস্তি নয়। ন্যায়বিচার মানে ন্যায্যতা। দায়মুক্তি যদি ন্যায্যভাবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেটা ন্যায়বিচারেরই একটা অংশ। কিন্তু যখন এটা অন্যায়ের আড়াল হয়ে যায়, তখন সেটা ন্যায়বিচারের শত্রু।

আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটা সমাজ তৈরি করা যেখানে সৎ মানুষ নির্ভয়ে কাজ করতে পারে, আর অসৎ মানুষ শাস্তি থেকে বাঁচতে পারে না। দায়মুক্তি সেই লক্ষ্য অর্জনের একটা হাতিয়ার হতে পারে, যদি সেটা সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয়।

বিষয় : সাধারণ জ্ঞান
দায়মুক্তি কী এবং কেন? | Preparation