- হোম
- চাকরি পরীক্ষার প্রস্তুতি
প্রাক-প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ৩০.১০.২০১৫
- প্রাথমিক শিক্ষক ২০১৫
- বাংলা
'অর্ঘ্য' শব্দের অর্থ কি?
‘অর্ঘ্য’ শব্দটি সংস্কৃত ‘অর্ঘ’ ধাতু থেকে এসেছে, যার ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো মূল্য বা পূজা। কিন্তু ব্যবহারিক ক্ষেত্রে এটি কেবল মূল্য নয়, বরং এমন কিছু উপাচার বা দ্রব্যকে বোঝায় যা শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য উৎসর্গ করা হয়।
প্রাচীন শাস্ত্রমতে, কোনো দেবতা বা পরম শ্রদ্ধেয় অতিথি (যেমন গুরু বা রাজা) উপস্থিত হলে তাঁদেরকে আটটি বিশেষ দ্রব্য দিয়ে বরণ করা হতো। এই আটটি দ্রব্যের সমষ্টিকে একত্রে ‘অর্ঘ্য’ বলা হয়। এগুলো হলো-
১. দধি (দই)
২. অক্ষত (আতপ চাল)
৩. কুশ (এক ধরণের পবিত্র ঘাস)
৪. পুষ্প (ফুল)
৫. দূর্বা (ঘাস)
৬. তিল
৭. সরিষা
৮. জল বা মধু
যেহেতু এই তালিকায় থাকা প্রতিটি জিনিসই এক একটি দ্রব্য বা উপকরণ, তাই ‘অর্ঘ্য’ শব্দের সবচেয়ে সঠিক ও লজিক্যাল অর্থ হলো ‘পূজার উপকরণ’। এটি কেবল একটি বস্তু নয়, বরং শ্রদ্ধার প্রতীক হিসেবে নিবেদিত উপাচারের সেট।
কেন অন্য বিকল্পগুলো ভুল?
উত্তরের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করতে কেন অন্যগুলো ভুল তা জানা জরুরি:
পূজার বাদ্য: পূজা বা উৎসবে ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্রকে ‘বাদ্য’ বা ‘রণবাদ্য’ বলা হয় (যেমন-ঢাক, ঢোল, কাঁসর)। অর্ঘ্যের সাথে বাদ্যযন্ত্রের কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। বাদ্য হলো শব্দের মাধ্যমে আহ্বান, আর অর্ঘ্য হলো বস্তুর মাধ্যমে নিবেদন।
পূজার মন্ডপ: মন্ডপ হলো পূজার স্থান বা প্যান্ডেল। এটি একটি অবকাঠামো। অর্ঘ্য কোনো স্থান নয়, বরং ওই স্থানে নিবেদিত দ্রব্য।
পূজার আধার: ‘আধার’ শব্দের অর্থ হলো পাত্র বা কন্টেইনার। অর্ঘ্য রাখার পাত্রকে ‘অর্ঘ্যপাত্র’ বলা হয়। অর্থাৎ পাত্রটি হলো আধার, আর তার ভেতরে থাকা উপকরণগুলো হলো অর্ঘ্য। তাই আধার এবং অর্ঘ্য এক জিনিস নয়।
ব্যাকরণগত বিশ্লেষণ ও শব্দতত্ত্ব
শব্দার্থ ও বুৎপত্তি:
‘অর্ঘ্য’ একটি বিশেষ্য পদ (Noun)।
এর সংস্কৃত উৎস: অর্ঘ + য (অর্ঘ দান করার যোগ্য যা)।
এর সমার্থক শব্দ হিসেবে আমরা—উপহার, উপঢৌকন, বলি বা পূজা-সামগ্রী ব্যবহার করতে পারি।
বাক্যে প্রয়োগের উদাহরণ:
“ভক্তরা দেবতার চরণে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করলেন।” (এখানে পুষ্প+অর্ঘ্য = ফুলের তৈরি উপকরণ)।
“বীর যোদ্ধাকে দেশের পক্ষ থেকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধার্ঘ্য।” (এখানে শ্রদ্ধা+অর্ঘ্য = শ্রদ্ধারূপ উপাচার)।
অতিরিক্ত তথ্য ও সাহিত্যিক সংযোগ (Value Addition)
আপনি যেহেতু সাহিত্যের গভীরতা পছন্দ করেন, তাই অর্ঘ্য শব্দের সাথে জড়িত কিছু চমৎকার তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো:
ক) রবীন্দ্রনাথ ও অর্ঘ্য:রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পূজা’ পর্যায়ের অনেক কবিতায় অর্ঘ্য শব্দটির চমৎকার প্রয়োগ দেখা যায়। তিনি কেবল ফুল বা বেলপাতাকে অর্ঘ্য বলেননি, বরং নিজের জীবনকেও দেবতার চরণে ‘অর্ঘ্য’ হিসেবে নিবেদন করার কথা বলেছেন। তাঁর একটি পঙ্ক্তি এমন— “আমার সকল দুখেরে করেছি তোমারি শেষ অর্ঘ্য।” এখানে অর্ঘ্য মানে হলো নিজের যাতনাকেও পরম শ্রদ্ধায় উৎসর্গ করা।
খ) বেদব্যাসের মহাভারত ও রাজসূয় যজ্ঞ:আপনি আগে বেদব্যাসের কথা উল্লেখ করেছিলেন। মহাভারতের ‘রাজসূয় যজ্ঞ’ পর্বে আমরা দেখি, যখন মহারাজ যুধিষ্ঠির যজ্ঞের আয়োজন করেন, তখন সেখানে উপস্থিত সকল মুনি-ঋষি ও রাজাদের মধ্যে ‘অর্ঘ্য’ প্রদানের একটি নিয়ম ছিল। সেখানে শ্রীকৃষ্ণকে ‘অগ্রহজ’ বা প্রধান অতিথি হিসেবে প্রথম অর্ঘ্য প্রদান করা হয়। এটি ছিল তৎকালীন সময়ের সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শনের রীতি। অর্থাৎ অর্ঘ্য কেবল পূজার জিনিস নয়, এটি রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্মানেরও বড় প্রতীক ছিল।
গ) সন্ধির নিয়ম (অর্ঘ্য সম্পর্কিত):অর্ঘ্য শব্দটি অনেক সময় সন্ধি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যেমন:
পুষ্পার্ঘ্য (পুষ্প + অর্ঘ্য): এখানে 'অ' + 'অ' মিলে 'আ' হয়েছে। এটি স্বরসন্ধির একটি ধ্রুপদী উদাহরণ।
রক্তার্ঘ্য (রক্ত + অর্ঘ্য): শহীদদের স্মরণে আমরা এই শব্দটি ব্যবহার করি, যা তাঁদের ত্যাগের প্রতি উপকরণস্বরূপ শ্রদ্ধা।
বর্তমান সময়ে অর্ঘ্যের ব্যবহার
আধুনিক বাংলা সাহিত্যে এবং সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আমরা দেখি অতিথিদের ‘পুষ্পস্তবক’ দেওয়া হয়। এটি আসলে প্রাচীন অর্ঘ্য প্রদানেরই একটি আধুনিক সংস্করণ। আগে যেখানে দধি-তিল-জল দেওয়া হতো, এখন সেখানে কেবল একগুচ্ছ ফুল দেওয়া হয়। তবে অন্তরের শ্রদ্ধা একই থাকে।
পরিশেষে বলা যায়, ‘অর্ঘ্য’ শব্দটি কেবল ‘পূজার উপকরণ’ নয়, এটি মানুষের ভক্তি ও শ্রদ্ধার এক বস্তুনিষ্ঠ বহিঃপ্রকাশ। এটি আমাদের শেখায় যে, সৃষ্টিকর্তা বা কোনো মহান ব্যক্তিকে কেবল মুখে সম্মান জানালে হয় না, সাধ্যমতো শ্রেষ্ঠ উপকরণ দিয়ে তাঁকে বরণ করে নিতে হয়। ১৯০৪ সালে ফিফা যেভাবে বিশ্ব ফুটবলের এক অখণ্ড মঞ্চ তৈরি করেছিল বা জীবনানন্দ দাশ যেভাবে তাঁর কবিতায় এক ‘মহাপৃথিবী’ নির্মাণ করেছিলেন, ‘অর্ঘ্য’ শব্দটি ঠিক তেমনি ক্ষুদ্র উপকরণের মাধ্যমে এক বিশাল ভাবনার জগত তৈরি করে।
সম্পর্কিত প্রশ্ন সমূহ
গুণহীনে ত্যাগ কর। বাক্যে নিম্নরেখ শব্দটি কোন কারকে কোন বিভক্তি?

