• হোম
  • চাকরি পরীক্ষার প্রস্তুতি

৩৪তম বিসিএস প্রিলিমিনারি ও লিখিত প্রশ্ন সমাধান ২০১৩

  • বিসিএস ২০১৩
  • বাংলাদেশ
Back

জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এর মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ উল্লেখ করুন। এই শিক্ষানীতি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় কি ধরনের সংস্কার নিশ্চিত করতে পারে-বিস্তারিত বর্ণনা করুন।

একটি উন্নত আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য, একটি সুষম সুস্থ-পরিচ্ছন্ন মানবিক সমাজ গড়ে তোলার জন্য সর্বজনীন শিক্ষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। পৃথিবীর উন্নয়ন-অগ্রগতির ইতিহাসে কোনো জাতি, দেশ, রাষ্ট্র এগুতে পারে না তার গণমানুষকে নিরক্ষর রেখে, অজ্ঞানতা-অশিক্ষা-কুশিক্ষার অন্ধকারে রেখে। এ ধ্রুব সত্যকে বিবেচনায় রেখে জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীকে প্রধান করে ৮ এপ্রিল ২০০৯ জাতীয় শিক্ষানীতি ২০০৯ কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটি ২ সেপ্টেম্বর ২০০৯ শিক্ষামন্ত্রী ড. নুরুল ইসলাম নাহিদের কাছে তাদের প্রণীত জাতীয় শিক্ষানীতির চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেন। তারপর তা ৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়। প্রধানমন্ত্রী গৃহীত এ শিক্ষানীতিই 'জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০' হিসেবে পরিচিত।

শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি ও খসড়া প্রতিবেদন: ১৯৭৪ সালের ড. কুদরত-এ-খুদা কমিশনের আলোকে ১৯৯৭ সালে প্রণীত ড. শামসুল হক শিক্ষানীতিকে যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ৮ এপ্রিল ২০০৯ জাতীয় অধ্যাপক কথীর চৌধুরীকে প্রধান করে ১৬ সদস্যবিশিষ্ট একটি জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি গঠন করে। পরবর্তীতে এ কমিটিতে অধ্যাপক ড. খলিকুজ্জামানকে কো-চেয়ারম্যান করা হয় এবং ২ জন সদস্যকে কো-অপ্ট করা হয়। এ কমিটি প্রথম সভা করে ৩ মে ২০০৯। মোট ২৩টি সভার মাধ্যমে এ কমিটি চূড়ান্ত খসড়া রিপোর্ট সম্পন্ন করে। এ চূড়ান্ত খসড়া করতে গিয়ে কমিটি ৫৬টি সংস্থা ও সংগঠনের প্রতিনিধিদের সাথে আলাদা আলাদা বিস্তারিত মত বিনিময় করেন। পরবর্তীতে ২ সেপ্টেম্বর ২০০৯ চূড়ান্ত খসড়া প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেয়।

শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য: জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর মূল উদ্দেশ্য মানবতার বিকাশ এবং জনমুখী উন্নয়নে ও প্রগতিতে নেতৃত্বদানের উপযোগী মননশীল, যুক্তিবাদী, নীতিবান, সকল ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, কুসংস্কারমুক্ত, পরমতসহিষ্ণু, অসাম্প্রদায়িক, দেশপ্রেমিক ও কর্মকুশল নাগরিক গড়ে তোলা। পাশাপাশি, শিক্ষার মাধ্যমে জাতিকে দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলার বৈশিষ্ট্য ও দক্ষতা অর্জনে সক্ষম করে তোলা। এ উদ্দেশ্য, লক্ষ্য ও নীতিকে সামনে রেখে নিচে ধারাবাহিকভাবে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর উল্লেখযোগ্য লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য উপস্থাপন করা হলো:

১. শিক্ষার সর্বস্তরে সাংবিধানিক নিশ্চয়তার প্রতিফলন ঘটানো এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীদের সচেতন করা।

২. ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে নৈতিক, মানবিক, সাংস্কৃতিক, বিজ্ঞানভিত্তিক ও সামাজিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠাকল্পে শিক্ষার্থীদের মননে, কর্মে ও ব্যবহারিক জীবনে উদ্দীপনা সৃষ্টি করা।

৩. মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করে তোলা এবং তাদের চিন্তা চেতনায় দেশাত্মবোধ, জাতীয়তাবোধ এবং চরিত্রে সুনাগরিকের গুণাবলীর (যেমন- ন্যায়বোধ, ধর্মনিরপেক্ষতাবোধ, কর্তব্যবোধ, মানবাধিকার সচেতনতা, শৃঙ্খলা, সহ-জীবনযাপনের মানসিকতা, সৌহার্দ্য, অধ্যবসায় ইত্যাদি) বিকাশ ঘটানো।

৪. জাতীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারা বিকশিত করে প্রজন্ম পরস্পরায় সঞ্চালনের ব্যবস্থা করা।

৫. দেশজ আবহ ও উপাদান সম্পৃক্ততার মাধ্যমে শিক্ষাকে শিক্ষার্থীর চিন্তাচেতনা ও সৃজনশীলতার উজ্জীবন এবং তার জীবনঘনিষ্ঠ বিকাশে সহায়তা করা।

৬. দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি সাধনের জন্য শিক্ষাকে সৃজনশীল, প্রয়োগমুখী ও উৎপাদন-সহায়ক করে তোলা; শিক্ষার্থীদেরকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব হিসেবে গড়ে তোলা এবং তাদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলীর বিকাশে সহায়তা প্রদান করা।

৭. জাতি, ধর্ম, গোত্র নির্বিশেষে আর্থ-সামাজিক শ্রেণীবৈষম্য দূর করা, বিশ্ব-ভ্রাতৃত্ব, অসাম্প্রদায়িকতা, সৌহার্দ্য ও মানুষে মানুষে সহমর্মিতাবোধ গড়ে তোলা এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে তোলা।

৮. বৈষম্যহীন সমাজ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে মেধা ও প্রবণতা অনুযায়ী স্থানিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান নির্বিশেষে সকলের জন্য শিক্ষালাভের সমান সুযোগ-সুবিধা অবারিত করা।

৯. গণতান্ত্রিক চেতনাবোধ বিকাশের জন্য পারস্পরিক মতাদর্শের প্রতি সহনশীল হওয়া এবং জীবনমুখী, বস্তুনিষ্ঠ ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বিকাশে সহায়তা করা।

১০. মুখস্থ করা বিদ্যার পরিবর্তে বিকশিত চিন্তাশক্তি, কল্পনাশক্তি এবং অনুসন্ধিৎসু মননের অধিকারী হয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিস্তরের প্রান্তিক যোগ্যতা অর্জন নিশ্চিত করা।

১১. জ্ঞানভিত্তিক তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর (ডিজিটাল) বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে তথ্যপ্রযুক্তি (ICT) এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য (গণিত, বিজ্ঞান ও ইংরেজি) শিক্ষাকে যথাযথ গুরুত্ব প্রদান করা।

১২. শিক্ষাকে ব্যাপকভিত্তিক করার লক্ষ্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার ওপর জোর দেয়া, শ্রমের প্রতি শিক্ষার্থীদেরকে শ্রদ্ধাশীল ও আগ্রহী করে তোলা এবং শিক্ষার স্তর নির্বিশেবে আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত হওয়ার জন্য বৃত্তিমূলক শিক্ষায় দক্ষতা অর্জনে সমর্থ করা।

১৩. প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিশুর/শিক্ষার্থীর সুরক্ষা ও যথাযথ বিকাশের অনুকূল আনন্দময় ও সৃজনশীল পরিবেশ গড়ে তোলা এবং সেটি অব্যাহত রাখা।

১৪. শিক্ষার্থীদের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনসহ প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশ-সচেতনতা এবং এতদসংক্রান্ত বিষয়ে দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টি করা।

১৫. উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষা চর্চা এবং শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সকল কার্যক্রম যাতে সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হতে পারে সেই লক্ষ্যে যথাযথ আবহ ও পারিপার্শ্বিকতা নিশ্চিত করা।

১৬. দেশের পশ্চাৎপদ অঞ্চলগুলোতে শিক্ষার উন্নয়নে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

১৭. পথশিশুসহ আর্থ-সামাজিকভাবে বঞ্চিত সকল ছেলেমেয়েকে শিক্ষার আওতায় নিয়ে আসা।

১৮. দেশের আদিবাসীসহ সকল ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সংস্কৃতি ও ভাষার বিকাশ ঘটানো।

১৯. প্রতিবন্ধীদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা।

২০. দেশের জনগোষ্ঠীকে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করা এবং সেই অর্জন ধরে রাখা।

১. প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা: জাতীয় শিক্ষানীতি কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের জন্য এক বছর মেয়াদি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা হবে। এর জন্য প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বাড়তি শিক্ষকের পদ সৃষ্টি এবং শ্রেণীকক্ষ বাড়াতে হবে। আদিবাসী শিশুরা যাতে নিজেদের ভাষা শিখতে পারে, সেজন্য আদিবাসী শিক্ষক ও পাঠ্যপুস্তকের ব্যবস্থা করা হবে। পিছিয়ে পড়া এলাকাগুলোতে অবস্থিত বিদ্যালয়সহ গ্রামীণ বিদ্যালয়গুলোকে বিশেষ সহায়তা দেয়া। হবে। প্রাথমিক শিক্ষা হবে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত এবং অবৈতনিক, সর্বজনীন ও বাধ্যতামূলক। প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার ধারা নির্বিশেষে সব শিক্ষার্থীকে নির্দিষ্ট শ্রেণীর পাঠ্যসূচি অনুযায়ী বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বাংলাদেশ স্টাডিজ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ধারণাসহ প্রাকৃতিক পরিবেশ পরিচিতি এবং তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞান বাধ্যতামূলকভাবে পড়তে হবে। এর পাশাপাশি সব শিক্ষার্থীর জন্য নিজ নিজ ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষার ব্যবস্থা থাকবে। পঞ্চম শ্রেণীর পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের উপজেলা, পৌরসভা, থানা পর্যায়ে স্থানীয় সমাজ কমিটি বা স্থানীয় সরকারের যৌথ ব্যবস্থাপনার অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত বৃত্তি দেয়া হবে। ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাক-বৃত্তিমূলক শিক্ষা সবার জন্য বাধ্যতামূলক হবে। ২০১৮ সালের মধ্যে তিন ধাপে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা করা হবে। এর মধ্যে প্রথম ধাপে ২০১২ সালে ষষ্ঠ শ্রেণীতে উন্নীত হবে প্রাথমিক শিক্ষা। ২০১৫ সালে সপ্তম এবং সর্বশেষ ২০১৮ সালে অষ্টম শ্রেণীতে উন্নীত হবে এ স্তর। অধ্যাপক কাজী খলীকুজ্জামান জানান, মূলত আর্থিক দিকটি বিবেচনায় রেখে সময় নেয়া হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত হবে ১:৩০। এ লক্ষ্য ২০১৮ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে অর্জন করা হবে।

২. মাধ্যমিক শিক্ষা: মাধ্যমিক শিক্ষান্তর হবে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত। দ্বাদশ শ্রেণী শেষে মাধ্যমিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। মাধ্যমিক শিক্ষাস্তরে সাধারণ, মাদরাসা ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ধারায় বাংলা, ইংরেজি, গণিত, তথ্যপ্রযুক্তি ও বাংলাদেশ স্টাডিজ শিক্ষায় অভিন্ন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি অনুসরণ করা হবে। ১০ম শ্রেণী শেষে সমাপনী পরীক্ষা উপজেলা/পৌরসভা/থানা পর্যায়ে অভিন্ন প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হবে। এই পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে বৃত্তি প্রদান করা হবে।

৩. উচ্চশিক্ষা: এ স্তরে বর্তমানে কলেজগুলোতে প্রদত্ত তিন বছর মেয়াদি বিদ্যমান ডিগ্রি পাস কোর্স তুলে দেয়া হবে। এর পরিবর্তে চার বছর মেয়াদি অনার্স পাঠদান করা হবে। আর এই চার বছর মেয়াদি ডিগ্রি হবে প্রফেশনাল ডিগ্রি বা প্রান্তিক ডিগ্রি। শিক্ষকতা ছাড়া সব ধরনের চাকরির জন্য এ ডিগ্রিই যথেষ্ট। শিক্ষকতার জন্য মাস্টার্স ডিগ্রি বাধ্যতামূলক। ডিগ্রি ও অনার্স কলেজগুলো মনিটরিংয়ের জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় সদরে আঞ্চলিক কেন্দ্র হবে। এসব কেন্দ্র পরে এক একটি পূর্ণাঙ্গ এফিলিয়েটিং বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে কাজ করবে, যারা নিজ নিজ এলাকার কলেজ অনুমোদন করবে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করবে ইউজিসি। তবে প্রয়োজন আর বাস্তবতার কারণে ইউজিসি'র নাম পরিবর্তন করে (তাদেরই প্রস্তাব অনুযায়ী) নাম হয় 'হায়ার এডুকেশন কমিশন অব বাংলাদেশ'। এ লক্ষ্যে আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অভিন্ন আইন দরকার। ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশের সংশোধন দরকার। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নির্বাচন এবং তাদের প্রশিক্ষণ দানের জন্য বেসরকারি শিক্ষক কমিশন গঠন করা হবে।

৪. বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষা: অষ্টম শ্রেণী শেষে প্রাথমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা ইচ্ছা করলে বৃত্তিমূলক শিক্ষায় প্রবেশ করতে পারবে। বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে প্রতিটি উপজেলায় একটি করে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হবে। এছাড়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট ও লেদার ইনস্টিটিউটের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হবে। বৃত্তিমূলক ও ডিপ্লোমা পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুবিধাদি ব্যবহার করে সান্ধ্যকালীন ও খণ্ডকালীন শিক্ষাক্রমের মাধ্যমে স্কুল পরিত্যাগকারী বয়স্কদের বিভিন্ন বৃত্তিমূলক শিক্ষাদান করে তাদেরকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করা হবে। ডিপ্লোমাধারীদের জন্য যথাযথ নির্বাচনের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। বেসরকারি খাতে মানসম্পন্ন বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনকে উৎসাহিত করা হবে, এমপিওভুক্তিতে আগ্রাধিকার প্রদান এবং যন্ত্রপাতি, সাজ-সরঞ্জামাদিসহ আর্থিক সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে।

৫. মাদরাসা শিক্ষা: প্রতিবেদনে মাদরাসা শিক্ষাকে যুগোপযোগী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলা হয়, মাদরাসা শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো সর্বশক্তিমান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসূল (স)-এর প্রতি সরল বিশ্বাস গড়ে তোলা এবং তাদের আচারসর্বস্ব নয় বরং শান্তির ধর্ম ইসলামের প্রকৃত মর্মার্থ অনুধাবনে সক্ষম করে তোলা। শিক্ষার অন্যান্য ধারার সাথে সমন্বয় রেখে ইবতেদায়ী পর্যায়ে নির্দিষ্ট শ্রেণীর পাঠ্যসূচি অনুযায়ী নির্ধারিত বিষয়সমূহ (বাংলা, ইংরেজি, নৈতিক শিক্ষা, বাংলাদেশ স্টাডিজ, গণিত, সামাজিক পরিবেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ধারণাসহ প্রাকৃতিক পরিবেশ পরিচিতি, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞান) বাধ্যতামূলকভাবে পড়তে হবে। একইভাবে মাধ্যমিক পর্যায়ে নির্ধারিত বিষয়সমূহ বাধ্যতামূলক থাকবে।

৬. শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত সুপারিশ: শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদনে শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে বলা হয়েছে, মাধ্যমিক স্তরে সরকারি কর্মকমিশনের অনুরূপ প্রস্তাবিত শিক্ষক নির্বাচনী কমিশন গঠন করে তার আওতায় লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে বিষয়ভিত্তিক প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক প্রতিবছর নিয়োগ করা হবে। নতুন নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের কাজে যোগদানের আগে মৌলিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সুপারিশ রয়েছে। এতে আরো বলা হয় স্কুল পর্যায়ে আগামী ৬/৭বছরের মধ্যে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত হবে ১: ৩০। শিক্ষার মাধ্যম হবে বাংলা। বিদেশীদের জন্য যথাযথ অনুমোদন সাপেক্ষে ইংরেজি মাধ্যম চালু থাকবে। তবে সেক্ষেত্রে সহজ বাংলা শিক্ষা দেয়ার ব্যবস্থাও রাখতে হবে। বিশেষ পদক্ষেপ হিসেবে যেসব বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আয়ের উৎস আছে সেসব এবং মিশনারি, ট্রাস্ট ও দেশী-বিদেশী এনজিও, সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে সরকারের শিক্ষা খাত থেকে বরাদ্দ না দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। অধিক হারে বেতন আদায়কারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বেতন আদায়ের নীতিমালা তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে।

৭. টিউশনি ও কোচিং ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ খসড়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে শিক্ষক সমাজের একাংশের নৈতিকতার অভাবে দেশে ব্যাপকভাবে প্রাইভেট টিউশনির ব্যবস্থা ও কোচিং সেন্টার চালু হয়েছে। তা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ দ্রুত গ্রহণ করা হবে। কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত নন এমন ব্যক্তি যদি কোচিং সেন্টার চালাতে চান তা পারবেন। তবে তা যথাযথ মানসম্পন্ন হতে হবে এবং চালু করার/রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হবে। কমিশনের সুপারিশে আরো বলা হয়েছে যে কোনো স্থানে ৫ বা ততোধিক শিক্ষার্থীর পারিশ্রমিকের বিনিময়ে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার যে কোনো ধারার যে কোনো বিষয়ে পাঠদান করা হলে তার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও নিবন্ধন গ্রহণ করতে হবে।

প্রণীত শিক্ষানীতি: প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষার সকল স্তরে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান নিশ্চিত করার ঘোষণা দিয়ে শিক্ষার ২৪টি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে প্রণীত ১৯টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত এবং ৬৮ হাজার কোটি টাকায় বাস্তবায়নযোগ্য এ শিক্ষানীতির উল্লেখযোগ্য বিষয়সমূহ হলো:

  • তিন স্তরবিশিষ্ট শিক্ষাব্যবস্থা
  • প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষা চালু
  • প্রাথমিক শিক্ষার ১১টি লক্ষ্য নির্ধারণ
  • পঞ্চম শ্রেণীতে সমাপনী এবং অষ্টম শ্রেণীতে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পাবলিক পরীক্ষা
  • এক ও অভিন্ন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি চালু
  • নৈতিক শিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ।
  • অন্তর্ভুক্তিমূলক (ধর্ম, ছেলেমেয়ে, আর্থ-সামাজিক ও ভৌগোলিক অবস্থান,
  • আদিবাসীসহ সব জাতিসত্তা, প্রতিবন্ধী) শিক্ষাব্যবস্থা
  • দেশে বিরাজমান আবহ ও উপাদান সম্পৃক্ত শিক্ষাব্যবস্থা
  • মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা
  • উচ্চশিক্ষা মন্ত্রণালয় গঠন
  • একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন
  • একটি সমন্বিত শিক্ষা আইন প্রবর্তন।

উপসংহার: শিক্ষা মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার। মানসম্মত শিক্ষা যে কোনো জাতির জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। ইউনেস্কো গুণগত শিক্ষাকে টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত হিসেবে ঘোষণা করেছে। শিক্ষার মান উন্নয়ন ছাড়া ব্যক্তিগত ও জাতীয় উন্নতি অসম্ভব। উচ্চশিক্ষায় গবেষণার অপ্রতুলতাসহ আমাদের দেশে বিভিন্ন স্তরে শিক্ষার মান এখনো আশাব্যঞ্জক স্তরে পৌঁছেনি। তাই বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা জাতীয়তাবোধ ও মানসিক বিকাশে যেমন সহায়ক তেমনি অপরিহার্য। পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থার সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন এবং বাস্তবায়ন করতে পারলে তবেই এ জাতির মুক্তি সম্ভব।

শেয়ার :

সম্পর্কিত প্রশ্ন সমূহ