বিসিএস সম্পর্কে যা জানা জরুরি

প্রিপারেশন

২৩ ডিসেম্বর, ২০২৫

বিসিএস সম্পর্কে যা জানা জরুরি

ছবি : সংগৃহিত

বিসিএস হলো দেশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এবং প্রতিযোগিতামূলক সরকারি চাকরির পরীক্ষা। এই পরীক্ষার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোর মূল স্তম্ভ হিসেবে বিভিন্ন ক্যাডার সার্ভিসে কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। বিসিএসকে অনেকেই বলেন “স্বপ্নের চাকরি”, কারণ এটি শুধু একটি চাকরি নয়, বরং দেশের উন্নয়ন, নীতিনির্ধারণ এবং জনগণের সেবায় সরাসরি অবদান রাখার একটি বিরল সুযোগ।

বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন (বিপিএসসি) এই পরীক্ষার আয়োজন করে। প্রতি বছর লাখ লাখ তরুণ-তরুণী এই পরীক্ষায় অংশ নেন, যেখানে মাত্র কয়েক হাজার জনকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়। বিসিএসের মাধ্যমে যে ক্যাডারগুলোতে যোগদান করা যায়, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রশাসন, পুলিশ, পররাষ্ট্র, কর, শুল্ক, অডিট, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ মোট ২৬টি ক্যাডার সার্ভিস। এই ক্যাডারগুলোই মূলত বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্রকে চালিত করে।

আরো পড়ুন : সরকারি চাকরির পরীক্ষায় ব্যবহারিক নম্বর কীভাবে গণনা করা হয়

বিসিএস শুধু একটি চাকরির পরীক্ষা নয়, এটি একটি জীবনযাত্রার পরিবর্তনের নাম। এর মাধ্যমে একজন সাধারণ মানুষ দেশের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেন, সমাজের জন্য কাজ করতে পারেন এবং নিজের পরিবারের জন্য নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবন গড়ে তুলতে পারেন। তাই যারা দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা অনুভব করেন এবং চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত, তাদের জন্য বিসিএস একটি সেরা সম্ভাবনা।

এই ব্লগে আমরা বিসিএসের সবগুলো গুরুত্বপূর্ণ দিক ধাপে ধাপে জানবো, যাতে আপনার প্রস্তুতির পথ আরও স্পষ্ট ও সহজ হয়ে ওঠে।

বিসিএসে অংশগ্রহণের যোগ্যতা এবং প্রয়োজনীয়তা

বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে চাইলে কিছু নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণ করা আবশ্যক। বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) প্রতিটি বিসিএস বিজ্ঞপ্তিতে এই শর্তগুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে। নিচে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সাধারণভাবে প্রযোজ্য যোগ্যতাগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।

১. নাগরিকত্ব

শুধুমাত্র বাংলাদেশের নাগরিকরাই বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারেন। বিদেশি নাগরিকদের জন্য এই সুযোগ নেই।

২. বয়সসীমা

বয়সসীমা বিসিএসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। সাধারণত নিম্নলিখিত নিয়ম প্রযোজ্য:প্রথম দিনের বয়স হিসাব করা হয় যেদিন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়।সাধারণ প্রার্থীদের জন্য বয়স: ২১ থেকে ৩০ বছর।মুক্তিযোদ্ধা/শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এবং তাদের সন্তানদের জন্য বয়স: ২১ থেকে ৩২ বছর।প্রতিবন্ধী প্রার্থীদের জন্য বয়স: ২১ থেকে ৩২ বছর।উপজাতি প্রার্থীদের জন্যও কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা থাকে।

বয়সের হিসাবে সাধারণত ১ জানুয়ারি বা বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত তারিখ অনুসারে গণনা করা হয়। তাই বিজ্ঞপ্তি পড়ার সময় এই তারিখটি খুব মনোযোগ দিয়ে দেখতে হবে।

৩. শিক্ষাগত যোগ্যতা

বিসিএসে অংশগ্রহণের জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা হলো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক (সম্মান) বা সমমানের ডিগ্রি।কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রয়োজন হয় না, শুধু স্নাতক ডিগ্রি থাকলেই যথেষ্ট।যেসব বিষয়ে স্নাতক পাস করা হয়েছে, তা যেকোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হলেই চলবে। বিষয়ভিত্তিক কোনো বাধ্যবাধকতা সাধারণত নেই (কয়েকটি টেকনিক্যাল ক্যাডার বাদে)।

৪. শারীরিক যোগ্যতা (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)

কিছু নির্দিষ্ট ক্যাডারে (যেমন: পুলিশ, বিএসএফ, ফায়ার সার্ভিস) শারীরিক উচ্চতা, বুকের মাপ এবং দৃষ্টিশক্তির মানদণ্ড পূরণ করতে হয়।সাধারণ প্রশাসন, কর, শিক্ষা ইত্যাদি ক্যাডারে শারীরিক যোগ্যতার কোনো কঠোর শর্ত নেই।

৫. অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শর্ত

প্রার্থীকে কোনো ফৌজদারি মামলায় দণ্ডিত হওয়া চলবে না।কোনো সরকারি চাকরি থেকে বরখাস্ত বা অপসারিত হলে সাধারণত যোগ্য হওয়া যায় না।বিবাহিত বা অবিবাহিত উভয় অবস্থাতেই আবেদন করা যায়।

সংক্ষেপে মনে রাখার মতো বিষয়

বিসিএসে অংশ নিতে হলে আপনাকে অবশ্যই:বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবেনির্ধারিত বয়সের মধ্যে থাকতে হবেস্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি থাকতে হবে

এই তিনটি মূল শর্ত পূরণ করলেই আপনি বিসিএসের জন্য আবেদনের যোগ্য হয়ে যাবেন। তবে প্রতিটি বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি পড়ে সর্বশেষ নিয়ম নিশ্চিত করে নেওয়া উচিত, কারণ মাঝে মাঝে ছোটখাটো পরিবর্তন হয়।

আপনার যদি এই যোগ্যতাগুলোর মধ্যে কোনো বিষয়ে সন্দেহ থাকে বা নিজের ক্ষেত্রে কীভাবে প্রযোজ্য হবে তা জানতে চান, তাহলে কমেন্টে জানান। সাহায্য করব।

বিসিএস পরীক্ষার ধাপসমূহ

বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষা তিনটি প্রধান ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রতিটি ধাপের নিজস্ব গুরুত্ব ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সফলতার জন্য প্রত্যেক ধাপের প্রক্রিয়া ও প্রস্তুতি ভালোভাবে বোঝা জরুরি। নিচে তিনটি ধাপ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হলো।

প্রথম ধাপ: প্রিলিমিনারি পরীক্ষা (প্রাথমিক নির্বাচন পরীক্ষা)

প্রিলিমিনারি পরীক্ষা হলো পুরো বিসিএস প্রক্রিয়ার প্রথম ফিল্টার। এটি একটি বহুনির্বাচনী (এমসিকিউ) পরীক্ষা।মোট নম্বর: ২০০মোট প্রশ্ন: ২০০টিসময়: ২ ঘণ্টাবিষয়ভিত্তিক নম্বর বণ্টন (সাধারণত):বাংলা ভাষা ও সাহিত্য ৩৫ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য ৩৫বাংলাদেশ বিষয়াবলি ৩০আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি ২০সাধারণ বিজ্ঞান ১৫গণিত ১৫মানসিক দক্ষতা ১৫কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তি ১৫ভূগোল, পরিবেশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ১০

এই পরীক্ষায় নেগেটিভ মার্কিং থাকে। প্রতিটি ভুল উত্তরের জন্য ০.৫০ নম্বর কাটা যায়।প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই পরবর্তী ধাপে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়।

দ্বিতীয় ধাপ: লিখিত পরীক্ষা

লিখিত পরীক্ষা হলো বিসিএসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং কঠিন অংশ। এখান থেকেই মূলত মেধা তালিকা তৈরি হয়।মোট নম্বর: ৯০০ (সাধারণ ক্যাডার) / ১১০০ (প্রফেশনাল/টেকনিক্যাল ক্যাডার)পরীক্ষার সময়কাল: সাধারণত ৪ থেকে ৭ দিন ধরে চলে।

প্রধান বিষয়গুলো:বাংলাইংরেজিবাংলাদেশ বিষয়াবলিআন্তর্জাতিক বিষয়াবলিগণিতসাধারণ বিজ্ঞাননৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সুশাসনভূগোল, পরিবেশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা

কিছু ক্যাডারের জন্য অতিরিক্ত বিষয় (যেমন: পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, কৃষি, আইন ইত্যাদি) থাকে।লিখিত পরীক্ষায় সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও উপস্থাপনা দক্ষতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই ধাপে ভালো করতে পারলে ভাইভায় আসার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।

তৃতীয় ধাপ: মৌখিক পরীক্ষা (ভাইভা)

ভাইভা পরীক্ষা হলো বিসিএসের চূড়ান্ত ধাপ।মোট নম্বর: ২০০সময়: সাধারণত ২০ থেকে ৩৫ মিনিট

ভাইভায় যা যাচাই করা হয়:ব্যক্তিত্বআত্মবিশ্বাসযোগাযোগ দক্ষতাসাধারণ জ্ঞানবর্তমান ঘটনাবলি সম্পর্কে ধারণাপ্রার্থীর পড়াশোনা ও কাজের অভিজ্ঞতাক্যাডার পছন্দের যৌক্তিকতা

প্রশ্নের ধরন সাধারণত দুই ধরনের হয়:ব্যক্তিগত প্রশ্ন (নিজের জীবন, শিক্ষা, ক্যারিয়ার পরিকল্পনা)জ্ঞানভিত্তিক প্রশ্ন (বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়, নীতি-নৈতিকতা, সাম্প্রতিক ঘটনা)

ভাইভায় সততা, শান্ত থাকার ক্ষমতা ও স্পষ্ট উত্তর দেওয়ার দক্ষতা অনেক বেশি গুরুত্ব পায়।

সারসংক্ষেপ

বিসিএস পরীক্ষা মূলত তিনটি ধাপে সম্পন্ন হয়:প্রিলিমিনারি (ফিল্টার)লিখিত (মূল মেধা নির্ধারণ)মৌখিক (চূড়ান্ত বাছাই)

প্রতিটি ধাপের জন্য আলাদা প্রস্তুতি ও মানসিকতা প্রয়োজন। যারা ধাপগুলোর প্রক্রিয়া ভালোভাবে বুঝে নিয়মিত প্রস্তুতি নিতে পারেন, তাদের সফলতার সম্ভাবনা অনেক বেশি। পরবর্তী অংশে আমরা সিলেবাস ও প্রস্তুতির কৌশল নিয়ে আলোচনা করব।

সিলেবাস এবং বিষয়বস্তু থেকে কী পড়তে হবে?

বিসিএস পরীক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সঠিক সিলেবাস বোঝা এবং সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়া। নিচে প্রিলিমিনারি, লিখিত এবং ভাইভা পরীক্ষার জন্য প্রধান বিষয়গুলোর বিস্তারিত ধারণা দেওয়া হলো।

প্রিলিমিনারি পরীক্ষার সিলেবাস ও গুরুত্বপূর্ণ টপিকস

প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় মোট ২০০ নম্বরের এমসিকিউ থাকে। বিষয়ভিত্তিক মার্কস বণ্টন (সাধারণত) এরকম হয়:

  • বাংলা ভাষা ও সাহিত্য: ৩৫ নম্বর
  • ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য: ৩৫ নম্বর
  • বাংলাদেশ বিষয়াবলি: ৩০ নম্বর
  • আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি: ২০ নম্বর
  • সাধারণ বিজ্ঞান: ১৫ নম্বর
  • গণিত: ১৫ নম্বর
  • মানসিক দক্ষতা: ১৫ নম্বর
  • ভূগোল, পরিবেশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা: ১০ নম্বর
  • কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তি: ১০ নম্বর
  • নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সুশাসন: ১০ নম্বর

প্রিলিমিনারির জন্য অবশ্যই ভালোভাবে পড়তে হবে এমন টপিকস:

  • বাংলা: ব্যাকরণ (সন্ধি, সমাস, কারক, বাক্য পরিবর্তন), সাহিত্যের ইতিহাস, গুরুত্বপূর্ণ কবি ও লেখকের সংক্ষিপ্ত জীবনী।
  • ইংরেজি: Vocabulary, Idioms & Phrases, Preposition, Voice, Narration, Sentence Correction, Comprehension.
  • বাংলাদেশ বিষয়াবলি: মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, সংবিধান, সরকার ব্যবস্থা, অর্থনীতি, ভূগোল, জনসংখ্যা, সাম্প্রতিক ঘটনা।
  • আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি: জাতিসংঘ, সার্ক, বিমসটেক, জি-২০, সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক ঘটনা, বিশ্ব রাজনীতি।
  • গণিত: শতকরা, লাভ-ক্ষতি, সুদ, অনুপাত-সমানুপাত, গড়, সময়-দূরত্ব, জ্যামিতি।
  • সাধারণ বিজ্ঞান: জীববিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়নের মৌলিক ধারণা।
  • মানসিক দক্ষতা: সিরিজ, অ্যানালজি, কোডিং-ডিকোডিং, লজিক্যাল রিজনিং।

লিখিত পরীক্ষার সিলেবাস ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

লিখিত পরীক্ষায় মোট ৯০০ নম্বরের ১০টি পেপার থাকে (সাধারণ ক্যাডারের জন্য):

  1. বাংলা (২০০ নম্বর)
  2. ইংরেজি (২০০ নম্বর)
  3. বাংলাদেশ বিষয়াবলি (২০০ নম্বর)
  4. আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি (১০০ নম্বর)
  5. গণিত (১০০ নম্বর)
  6. সাধারণ বিজ্ঞান (১০০ নম্বর)
  7. নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সুশাসন (১০০ নম্বর)
  8. ভূগোল, পরিবেশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা (১০০ নম্বর)
  9. সাধারণ জ্ঞান (১০০ নম্বর)
  10. কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তি (১০০ নম্বর)

লিখিত পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি নম্বর পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে এমন বিষয়:

  • বাংলা ও ইংরেজি (প্রতিটি ২০০ নম্বর)
  • বাংলাদেশ বিষয়াবলি (২০০ নম্বর)
  • নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সুশাসন (অনেকে এখানে ভালো নম্বর পান)

ভাইভা পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি

ভাইভাতে ২০০ নম্বর। এখানে মূলত দেখা হয়:

  • আপনার ব্যক্তিত্ব
  • সাধারণ জ্ঞান ও সাম্প্রতিক ঘটনা
  • আপনার ক্যাডার পছন্দের যুক্তি
  • বাংলাদেশ ও বিশ্বের চলমান ঘটনা
  • আপনার শিক্ষাগত পটভূমি ও কাজের অভিজ্ঞতা (যদি থাকে)

সংক্ষিপ্ত পরামর্শ

প্রিলিমিনারির জন্য প্রথমে বেসিক ক্লিয়ার করুন।লিখিতের জন্য বাংলা, ইংরেজি ও বাংলাদেশ বিষয়াবলিতে বেশি সময় দিন।সব বিষয়ে একসঙ্গে পড়ার চেষ্টা না করে ধাপে ধাপে এগোনো ভালো।

সিলেবাস বোঝা মানে শুধু বইয়ের নাম জানা নয়, বরং কোন টপিক থেকে কত নম্বর আসার সম্ভাবনা বেশি তা জানা। এই ধারণা থাকলে প্রস্তুতি অনেকটা সহজ ও কার্যকর হয়ে যায়।

প্রস্তুতির কৌশল এবং টিপস

বিসিএস পরীক্ষায় সফলতা পেতে চাইলে শুধু পড়াশোনা করলেই হবে না, সঠিক কৌশল এবং পরিকল্পনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই অংশে আমরা ধাপে ধাপে দেখব কীভাবে স্মার্টলি প্রস্তুতি নেওয়া যায়।

১. নিজের বর্তমান অবস্থান বুঝে নিন

  • প্রথমেই একটা সত্যিকারের মূল্যায়ন করুন।
  • প্রিলিমিনারি দিয়ে শুরু করতে চান নাকি সরাসরি লিখিতের জন্য প্রস্তুতি নেবেন?
  • আপনার ব্যাকগ্রাউন্ড কোন বিষয়ে? কোন বিষয়ে দুর্বলতা বেশি?
  • একটা ছোট সেল্ফ অ্যাসেসমেন্ট করে নিলে পরে সময় নষ্ট কম হয়।

২. স্পষ্ট লক্ষ্য ও টাইমলাইন ঠিক করুন

যেমন:

  • আগামী ১২ মাসে পরীক্ষা দিতে চান।
  • প্রথম ৬ মাসে সিলেবাস শেষ করা।
  • পরের ৩ মাসে রিভিশন ও মক টেস্ট।
  • শেষ ৩ মাসে শুধু দুর্বলতা দূর করা ও ভাইভার প্রস্তুতি।
  • এই ধরনের টাইমলাইন থাকলে মনের মধ্যে একটা চাপ থাকে এবং অলসতা কমে।

৩. দৈনিক রুটিন তৈরি করুন (বাস্তবসম্মত)

একটা আদর্শ রুটিন হতে পারে এরকম:

  • সকাল ৬:০০ থেকে ৯:০০ বাংলা, ইংরেজি, গণিত।
  • দুপুর ১২:০০ থেকে ৩:০০ বাংলাদেশ বিষয়াবলি, আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি।
  • বিকেল ৪:০০ থেকে ৭:০০ সাধারণ বিজ্ঞান, কম্পিউটার, নৈতিকতা।
  • রাত ৯:০০ থেকে ১১:০০ পূর্ববর্তী বছরের প্রশ্ন সমাধান ও রিভিশন।
  • প্রতিদিন কমপক্ষে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পড়া জরুরি। তবে জোর করে ১৪ ঘণ্টা পড়ার চেষ্টা করলে শরীর ও মন দুটোই ভেঙে পড়ে।

৪. মক টেস্টকে অভ্যাসে পরিণত করুন

  • প্রিলিমিনারির জন্য সপ্তাহে কমপক্ষে ২টি ফুল মক টেস্ট দিন।
  • লিখিতের জন্য প্রতি সপ্তাহে ৪ থেকে ৫টি প্রশ্নের উত্তর লিখে সময় মেপে নিন।
  • ভুল থেকে শেখার জন্য টেস্টের পর অবশ্যই অ্যানালাইসিস করুন। কোন বিষয়ে কত মার্কস কম আসছে তা নোট করুন।

৫. সময় ব্যবস্থাপনার কিছু কার্যকর টিপস

  • প্রতিটি বিষয়ের জন্য ফিক্সড দিন রাখুন।
  • যেমন: শুক্রবার শুধু বাংলা ও ইংরেজি, শনিবার শুধু বাংলাদেশ বিষয়াবলি।
  • একই দিনে ৮টি বিষয় ঘাঁটার চেষ্টা করবেন না।প্রতিদিনের শেষে ৩০ মিনিট রিভিউ করুন।

৬. অনলাইন ও অফলাইন রিসোর্স ব্যবহার করুন

  • অনলাইন: ১০ মিনিট স্কুল, বিডি জবস, প্রফেসরস, ইউটিউব চ্যানেল (যেমন: বিসিএস ক্যাডার অ্যাকাডেমি, বিসিএস আইআর, লেকচার ফ্যাক্টরি)।
  • অফলাইন: কোচিংয়ে যাওয়া বাধ্যতামূলক নয়। তবে যদি যান তাহলে শুধু নির্দিষ্ট বিষয়ের জন্য যান, পুরোটা কোচিংয়ের উপর ছেড়ে দেবেন না।

৭. মানসিক প্রস্তুতি ও স্বাস্থ্যের যত্ন

  • প্রতিদিন ৩০ মিনিট হাঁটাহাঁটি বা হালকা ব্যায়াম করুন।
  • প্রতি ৪৫ মিনিট পড়ার পর ৫ থেকে ৭ মিনিট বিরতি নিন।
  • পরিবারের সাথে সময় কাটান, বন্ধুদের সাথে কথা বলুন।
  • নিজেকে বারবার মনে করিয়ে দিন যে এটা একটা দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, একদিনে সব শেষ হয়ে যাবে না।

সঠিক কৌশল মানে শুধু বেশি পড়া নয়, বরং স্মার্টলি ও ধারাবাহিকভাবে পড়া। যারা ধৈর্য ধরে এই পথে চলেছেন, তারাই শেষ পর্যন্ত ক্যাডার হয়েছেন। আপনিও পারবেন।

গুরুত্বপূর্ণ বই এবং স্টাডি ম্যাটেরিয়ালস

বিসিএস প্রস্তুতির জন্য সঠিক বই ও ম্যাটেরিয়াল নির্বাচন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিচে প্রিলিমিনারি, লিখিত এবং ভাইভার জন্য বেশিরভাগ প্রার্থীরা যেসব বই ও রিসোর্স ব্যবহার করে থাকেন তার একটি বাস্তবসম্মত ও জনপ্রিয় তালিকা দেওয়া হলো।

প্রিলিমিনারি পরীক্ষার জন্য

বাংলা

  • প্রফেসরস বাংলা সাহিত্য (মোস্তাফিজুর রহমান)
  • একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির বাংলা ১ম ও ২য় পত্রের বই
  • অরুণ কুমার সাহিত্য সমগ্র

ইংরেজি

  • প্রফেসরস ইংলিশ (মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান)
  • Oracle বা MP3 ইংরেজি বই
  • High School English Grammar & Composition (Wren & Martin)
  • English for Competitive Exams (আর কে আগারওয়াল)

গণিত

  • প্রফেসরস গণিত
  • Oracle গণিত
  • MP3 গণিত
  • এসএসসি ও এইচএসসি গণিতের বই (যেকোনো ভালো বোর্ড বই)

সাধারণ বিজ্ঞান

  • প্রফেসরস সাধারণ বিজ্ঞান
  • লেকচার সাধারণ বিজ্ঞান
  • এসএসসি ও এইচএসসি বিজ্ঞান বই (বিশেষ করে জীববিজ্ঞান, পদার্থ ও রসায়ন অংশ)

মানসিক দক্ষতা

  • প্রফেসরস মানসিক দক্ষতা
  • Oracle মানসিক
  • MP3 মানসিক দক্ষতারাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক দক্ষতার বই

বাংলাদেশ বিষয়াবলি

  • প্রফেসরস বাংলাদেশ বিষয়াবলি
  • Oracle বাংলাদেশ বিষয়াবলি
  • MP3 বাংলাদেশ বিষয়াবলি
  • একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়

আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি

  • প্রফেসরস আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি
  • Oracle আন্তর্জাতিক
  • The Economist বা BBC-এর সাম্প্রতিক ঘটনা সংক্রান্ত পড়া

লিখিত পরীক্ষার জন্য

বাংলা

  • অনার্স/মাস্টার্স লেভেলের বাংলা সাহিত্য বই
  • সৈয়দ মুজতবা আলী, রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুলের গুরুত্বপূর্ণ রচনা
  • বাংলা ব্যাকরণ ও নির্মিতি (ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বা অন্যান্য)

ইংরেজি

  • Advanced Learners Functional English (Chowdhury & Hossain)
  • English Grammar in Use (Raymond Murphy)
  • 30 Days to a More Powerful Vocabulary
  • প্রফেসরস ইংরেজি প্রিসিস ও কম্পোজিশন

বাংলাদেশ বিষয়াবলি ও আন্তর্জাতিক

  • বাংলাদেশের সংবিধান (প্রতি বছরের সংশোধনীসহ)
  • বাংলাদেশের অর্থনীতি (আবুল বাশার)
  • জাতীয় বাজেট ও পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা
  • বিশ্ব ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক (নরেশ চন্দ্র বা প্রফেসরস)

গণিত ও পরিসংখ্যান

  • প্রফেসরস লিখিত গণিত
  • এডভান্সড গণিত (এইচএসসি লেভেল থেকে শুরু করে)

সাধারণ বিজ্ঞান ও কম্পিউটার

  • লেকচার সাধারণ বিজ্ঞান
  • আইটি ও কম্পিউটার (Oracle বা প্রফেসরস)

ভাইভার জন্য

  • নিজের বিষয়ের অনার্স/মাস্টার্স বই
  • বর্তমান ঘটনাপ্রবাহ (দৈনিক পত্রিকা, প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, BBC Bangla)
  • সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ
  • বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উন্নয়ন প্রকল্পসমূহ
  • নিজের ক্যাডার পছন্দের যুক্তি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

অনলাইন ও অন্যান্য রিসোর্স

  • বিপিএসসি অফিসিয়াল ওয়েবসাইট (বিগত প্রশ্নপত্র ও সিলেবাস)
  • ইউটিউব চ্যানেল: 10 Minute School, Preparation BD
  • দৈনিক পত্রিকা অ্যাপ ও ওয়েবসাইট
  • প্রফেসরস, Oracle, MP3, লেকচারের অফিসিয়াল ফেসবুক গ্রুপ

এই তালিকা থেকে শুরু করলে বেশিরভাগ প্রার্থীরই প্রয়োজনীয়তা পূরণ হয়। তবে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাওয়া যায় যখন নিজের দুর্বলতা অনুযায়ী বই বেছে নিয়ে মক টেস্টের মাধ্যমে প্রস্তুতি নেওয়া হয়। প্রস্তুতির শুরুতে ২-৩টি সিরিজের বই নিয়ে শুরু করাই ভালো। পরে প্রয়োজন অনুযায়ী বাড়ানো যেতে পারে।

সাধারণ চ্যালেঞ্জ এবং কীভাবে সেগুলো কাটিয়ে উঠবেন

বিসিএস প্রস্তুতির পথে প্রায় প্রত্যেক প্রার্থীই কিছু না কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হন। এই চ্যালেঞ্জগুলোকে চিনে নেওয়া এবং সঠিকভাবে মোকাবিলা করা সফলতার অন্যতম বড় শর্ত। সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এমন কয়েকটি সমস্যা এবং সেগুলো কাটিয়ে ওঠার বাস্তবসম্মত উপায় নিচে প্যারাগ্রাফ আকারে তুলে ধরা হলো।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অতিরিক্ত সময়ের চাপ এবং সিলেবাস শেষ না হওয়ার ভয়। অনেকেই মনে করেন এত বড় সিলেবাস পুরোপুরি পড়া অসম্ভব। এই সমস্যা কাটাতে সিলেবাসকে তিন ভাগে ভাগ করে ফেলুন। প্রথম অংশে রাখুন যেসব টপিক থেকে ৭০-৮০ শতাংশ মার্কস আসার সম্ভাবনা বেশি। দ্বিতীয় অংশে রাখুন বোনাস মার্কসের টপিক এবং তৃতীয় অংশে রাখুন অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রতিদিনের পড়ার লক্ষ্য ছোট ছোট করে নিন। ১২-১৪ ঘণ্টা পড়ার পরিবর্তে ৭-৮ ঘণ্টা কার্যকর পড়ার অভ্যাস করলে সময়ের চাপ অনেক কমে যাবে।

দীর্ঘ প্রস্তুতির কারণে মানসিক চাপ ও হতাশা খুব সাধারণ। প্রতিদিনের রুটিন, ফলাফলের অপেক্ষা এবং অন্যদের সাফল্য দেখে নিজেকে ছোট মনে হওয়া অনেকেরই হয়। এই অবস্থা কাটাতে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট শারীরিক ব্যায়াম করুন। একটা ছোট ডায়েরিতে প্রতিদিনের অর্জন লিখে রাখুন, যত ছোটই হোক। সপ্তাহে একদিন পুরোপুরি বিরতি নিন। অন্য প্রার্থীদের সঙ্গে তুলনা বন্ধ করুন এবং নিজের গতির দিকে তাকান। হতাশা বেশি হলে ২-৩ দিন পড়া কমিয়ে দিন, তবে একেবারে বন্ধ করবেন না।

প্রিলিমিনারিতে অনেকেই ১২০-১৩০ এর মধ্যে আটকে থাকেন। এখান থেকে বের হওয়ার জন্য শুধু পড়লেই হবে না। প্রতিদিন ১-২টি করে মক টেস্ট দিন। ভুলগুলো লিখে রাখুন এবং সেই টপিকগুলো আবার পড়ুন। সাধারণ জ্ঞান ও বর্তমান ঘটনার উপর ফোকাস বাড়ান, কারণ এখান থেকে সবচেয়ে বেশি মার্কস বাড়ানো যায়। নেগেটিভ মার্কিং এড়াতে ৮০ শতাংশ নিশ্চিত না হলে প্রশ্ন এড়িয়ে যান।

লিখিত পরীক্ষায় সময় ম্যানেজমেন্ট না হওয়া আরেকটি বড় সমস্যা। প্রশ্নপত্র দেখে ভয় পাওয়া এবং কোন প্রশ্ন থেকে শুরু করবেন বুঝতে না পারা সাধারণ। এটি কাটাতে প্রতিদিন ৩ ঘণ্টার লিখিত মক টেস্ট দিন। প্রথম ৫ মিনিটে পুরো প্রশ্নপত্র দেখে সহজ প্রশ্ন চিহ্নিত করুন। সবচেয়ে সহজ প্রশ্ন দিয়ে শুরু করুন। প্রতিটি প্রশ্নের জন্য নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে রাখুন। প্রতিটি উত্তরে পরিষ্কার ভূমিকা, মূল আলোচনা ও উপসংহার রাখার অভ্যাস করুন।

ভাইভাতে নার্ভাস হওয়া এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব অনেকেরই হয়। লিখিত পাশ করার পরও অনেকে এখানে ভালো করতে পারেন না। এটি কাটাতে প্রতিদিন ১০-১৫ মিনিট আয়নার সামনে নিজের সঙ্গে কথা বলার অভ্যাস করুন। বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গে মক ভাইভা নিন। বাংলা ও ইংরেজি দুটোতেই উত্তর দেওয়ার চর্চা করুন। নিজের জীবনের অর্জন, ব্যর্থতা ও শিক্ষা নিয়ে স্পষ্ট ধারণা রাখুন। প্রশ্নের উত্তর না জানলে সৎভাবে বলুন, আন্দাজে উত্তর দেবেন না।

এই চ্যালেঞ্জগুলো সবারই হয়। পার্থক্য শুধু এখানে যে সফল প্রার্থীরা এগুলোকে বাধা না ভেবে সুযোগ হিসেবে দেখেন এবং ধীরে ধীরে কাটিয়ে ওঠেন। আপনিও পারবেন। শুধু নিয়মিত চেষ্টা আর নিজের উপর ভরসা রাখুন।

সফল বিসিএস ক্যাডারদের অভিজ্ঞতা এবং পরামর্শ

বিসিএস যাত্রা দেখতে যতটা কঠিন মনে হয়, সফল ক্যাডারদের কথা শুনলে বোঝা যায় এটি আসলে পরিশ্রম, ধৈর্য আর সঠিক দিকনির্দেশনার ফল। একজন প্রশাসন ক্যাডার, যিনি ৪৩তম বিসিএসে প্রথমবারেই সফল হয়েছেন, বলেছেন যে তিনি প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পড়তেন। কিন্তু সেই পড়া ছিল শুধু পড়া নয়, বরং সিরিয়াস প্র্যাকটিস। প্রতিদিন অন্তত ১৫০টি প্রিলিমিনারি প্রশ্ন সলভ করতেন এবং ভুলগুলো আলাদা করে নোট রাখতেন। লিখিতের জন্য প্রতি সপ্তাহে দুটি পূর্ণাঙ্গ মক টেস্ট দিতেন। ভাইভার জন্য নিজের সাথে কথা বলে প্র্যাকটিস করতেন। তিনি কখনো ভাবেননি যে এটাই তার শেষ চেষ্টা। বরং মনে করতেন এটা শুধু শুরু।

আরেকজন পুলিশ ক্যাডার, যিনি ৪১তম বিসিএসে দ্বিতীয় চেষ্টায় সফল হয়েছেন, জানিয়েছেন যে প্রথমবার প্রিলিমিনারিতে ফেল করার পর তিনি বুঝতে পেরেছিলেন তার দুর্বলতা ছিল বাংলা এবং ইংরেজিতে। দ্বিতীয় চেষ্টায় তিনি শুধু এই দুটি বিষয়ের ওপর বেশি জোর দিয়েছিলেন। প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে বাংলা গ্রামার এবং ইংরেজি কম্প্রিহেনশন প্র্যাকটিস করেছেন। ফলস্বরূপ দ্বিতীয় চেষ্টায় তিনি প্রথম ১০০০ এর মধ্যে এসেছেন। তার পরামর্শ একটাই, দুর্বলতাকে চিহ্নিত করুন এবং সেটাকেই আপনার সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ বানিয়ে ফেলুন।

একজন শিক্ষা ক্যাডার, যার চারবার চেষ্টার পর ৪৪তম বিসিএসে সফলতা এসেছে, বলেছেন যে প্রতিবারই তিনি ভেবেছিলেন এবার হবে। কিন্তু চতুর্থবারে তিনি বুঝেছেন যে বিসিএসের সবচেয়ে বড় শত্রু অস্থিরতা। তিনি পড়ার পরিমাণ কমিয়ে গুণগত মান বাড়িয়েছিলেন। প্রতিদিন ছয় ঘণ্টা পড়তেন, কিন্তু সেই ছয় ঘণ্টা ছিল সম্পূর্ণ ফোকাসড। কোনো সোশ্যাল মিডিয়া, কোনো অপ্রয়োজনীয় আড্ডা ছিল না। তার কথা, যতদিন না পারছেন ততদিন হাল ছাড়বেন না। প্রতিটি ব্যর্থতা আপনাকে আরও শক্তিশালী করে।

বিভিন্ন ক্যাডার থেকে সংগৃহীত কিছু সাধারণ কিন্তু খুবই কার্যকর পরামর্শ হলো, প্রতিদিনের রুটিন কখনো ভাঙবেন না, এমনকি ছুটির দিনেও। লিখিতের জন্য হাতের লেখা এবং উপস্থাপনা নিয়মিত প্র্যাকটিস করুন। ভাইভার জন্য কারেন্ট অ্যাফেয়ার্সের পাশাপাশি নিজের জেলা, বিভাগ এবং জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে ভালোভাবে প্রস্তুতি নিন। অন্যের সাফল্য দেখে হতাশ হবেন না, নিজের অগ্রগতির সাথে তুলনা করুন। শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার প্রতি খেয়াল রাখুন। পর্যাপ্ত ঘুম এবং হালকা ব্যায়াম আপনার পড়ার ক্ষমতা অনেক বাড়িয়ে দেবে।

সফল ক্যাডারদের সবচেয়ে বেশি শোনা কথাটি হলো, বিসিএস কোনো দৌড় নয়, এটা একটা ম্যারাথন। যে ধৈর্য ধরে ঠিক পথে থাকতে পারে, সে-ই শেষ পর্যন্ত জিতে। আপনার যাত্রাও সেই ম্যারাথনেরই অংশ। শুধু চালিয়ে যান। সঠিক সময়ে সঠিক ফল আসবেই।

বিসিএসের পরবর্তী ধাপ: ক্যারিয়ার এবং সুযোগ

বিসিএস পরীক্ষায় চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার পর একজনের জীবনে নতুন এক অধ্যায় শুরু হয়। এই সময়ে অনেকেই ভাবেন যে চাকরি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সব চিন্তা শেষ। কিন্তু বাস্তবে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার পরও অনেক কিছু জানা এবং বুঝে নেওয়া খুবই জরুরি। যোগদানের পর প্রথমেই মেডিকেল পরীক্ষা, পুলিশ ভেরিফিকেশন এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হয়। এরপর সাধারণত তিন থেকে বারো মাসের মধ্যে যোগদানের নোটিফিকেশন আসে। যোগদানের পর প্রথমে ফাউন্ডেশন ট্রেনিং হয় এবং তারপর নির্দিষ্ট ক্যাডার অনুযায়ী বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়।

প্রথম পোস্টিং সাধারণত মাঠ পর্যায়ে বা গ্রামীণ এলাকায় হয়। সাধারণ প্রশাসন ক্যাডারে সহকারী কমিশনার (প্রশাসন) বা সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে উপজেলা বা জেলায় কাজ শুরু করতে হয়। পুলিশ ক্যাডারে সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে মাঠে দায়িত্ব পালন করা হয়। কাস্টমস, কর, পররাষ্ট্র, অডিটসহ অন্যান্য ক্যাডারে সহকারী পরিচালক বা সমমানের পদে যোগদান হয়। এই প্রথম কয়েক বছর মাঠের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়ে প্রশাসনিক কাজ, জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং বাস্তব সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়ে।

বেতনের দিক থেকে প্রথম যোগদানে জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী গ্রেড নাইন এর বেতন স্কেল থাকে যা ২২০০০ থেকে ৫৩০৬০ টাকা। বিভিন্ন ভাতা যোগ হলে মোট মাসিক বেতন সাধারণত ৪৫ হাজার থেকে ৬৫ হাজার টাকার মধ্যে থাকে। এছাড়া বাসা ভাড়া ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, যাতায়াত ভাতা, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, পেনশন এবং গ্র্যাচুইটির মতো সুবিধা পাওয়া যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রমোশনের মাধ্যমে বেতন ও পদ উন্নতি হয়। একজন ক্যাডার কর্মকর্তা সাধারণত সহকারী কমিশনার থেকে শুরু করে উপজেলা নির্বাহী অফিসার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত সচিব এবং শেষ পর্যন্ত সচিব পদে পৌঁছাতে পারেন। ভালো কাজের মান বজায় রাখলে ২২ থেকে ২৮ বছরের মধ্যে সচিব পদে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

এছাড়া বিসিএস ক্যাডারে অনেক অতিরিক্ত সুযোগ রয়েছে। সরকারি বৃত্তিতে বিদেশে উচ্চশিক্ষা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রকল্পে কাজ করা, ডেপুটেশনে বিদেশে যাওয়া, প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশ ভ্রমণ এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রেখে উচ্চ পদে যাওয়ার সুযোগ অনেকের জন্য আকর্ষণীয়। বিসিএস শুধু একটি চাকরি নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার যেখানে সমাজে সম্মান, প্রভাব এবং স্থায়িত্ব পাওয়া যায়। প্রথম কয়েক বছর কঠিন হতে পারে কিন্তু ধৈর্য, সততা এবং কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকলে এই পেশা জীবনকে অর্থবহ করে তুলতে পারে।

যারা বিসিএসের স্বপ্ন দেখছেন তাদের জন্য একটি কথা মনে রাখা জরুরি। পরীক্ষা পাশ করাটা শুধু শুরু। আসল যাত্রা তখনই শুরু হয় যখন আপনি ক্যাডার হিসেবে শপথ নেন এবং দেশের জন্য কাজ শুরু করেন। আপনার এই দীর্ঘ ক্যারিয়ার পথে সফলতা কামনা করি।

উপসংহার

বিসিএস কখনো শুধু একটা পরীক্ষা নয়। এটা একটা দীর্ঘ যাত্রা, যেখানে ধৈর্য, নিয়মানুবর্তিতা আর স্বপ্নের প্রতি অটল বিশ্বাসই সবচেয়ে বড় সম্পদ।

প্রতিদিনের ছোট ছোট প্রচেষ্টা, বারবার হার না মানার মানসিকতা আর সঠিক দিকনির্দেশনা থাকলে এই পথ কখনো অসম্ভব হয়ে ওঠে না।

অনেকে এসে মাঝপথে থেমে যান, আবার অনেকে বারবার চেষ্টা করে শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যান। সফলদের গল্প বলে, ফলাফলের চেয়ে প্রক্রিয়াটাই আসলে বেশি মূল্যবান। আপনি কতটা পড়লেন তার চেয়ে বড় কথা হলো কতটা সচেতনভাবে, ধারাবাহিকভাবে আর আন্তরিকতার সাথে পড়লেন।

আজ হয়তো ক্লান্ত লাগছে। হয়তো সন্দেহ হচ্ছে। হয়তো ফলাফলের চিন্তায় মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মনে রাখবেন, যেদিন আপনি হাল ছেড়ে দিতে চাইবেন, সেদিনই আসলে সফলতার সবচেয়ে কাছে থাকবেন।

এই পথে আপনি একা নন। লাখো তরুণ-তরুণী একই স্বপ্ন দেখছে, একই লড়াই করছে। তাই নিজের ওপর ভরসা রাখুন। প্রতিদিন একটু একটু করে এগিয়ে যান।

যেদিন আপনি ক্যাডার হয়ে নিজেকে দেখবেন, সেদিন বুঝবেন যে সময়, পরিশ্রম আর ধৈর্য কখনো বৃথা যায় না।

আজ থেকেই শুরু করুন। কালকের জন্য অপেক্ষা না করে আজই একটা ছোট পদক্ষেপ নিন।

আপনার স্বপ্ন অপেক্ষা করছে।আপনি কি প্রস্তুত?

সফলতা শুধুই আপনার জন্য।

শুভকামনা রইল।

বিষয় : সাধারণ জ্ঞান
টপিকস : বিসিএস, বিসিএস পরীক্ষা, বিসিএস পরীক্ষা প্রস্তুতি, বিসিএস সম্পর্কে যা জানা জরুরি