- হোম
- চাকরি পরীক্ষার প্রস্তুতি
প্রাক-প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ৩০.১০.২০১৫
- প্রাথমিক শিক্ষক ২০১৫
- বাংলা
বাংলা ভাষায় যতি চিহ্ন প্রচলন করেন কে?
বাংলা গদ্যের জনক এবং আধুনিক বাংলা লিখন পদ্ধতির পথপ্রদর্শক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১) বাংলা ভাষায় যতি চিহ্ন বা বিরাম চিহ্নের সুসংগত ব্যবহার প্রচলন করেন। তাঁর এই অবদান বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
যতি চিহ্ন প্রচলনের প্রেক্ষাপট
উনিশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলা লেখায় কোনো সুনির্দিষ্ট বিরাম চিহ্নের ব্যবহার ছিল না। ফলে লেখা পড়তে গিয়ে বাক্যের মানে বুঝতে পাঠকদের অসুবিধা হতো। বাক্য কোথায় শেষ হচ্ছে, কোথায় থামতে হবে, কোথায় প্রশ্ন করা হচ্ছে - এসব বোঝার কোনো সুস্পষ্ট উপায় ছিল না। সংস্কৃত ভাষায় দাঁড়ি (।) এবং দ্বিদাঁড়ি (।।) ব্যবহার হতো, কিন্তু তা পর্যাপ্ত ছিল না আধুনিক গদ্যের জন্য।
বিদ্যাসাগরের অবদান
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ইংরেজি punctuation marks এর আদলে বাংলায় যতি চিহ্নের প্রচলন করেন। ১৮৫৫ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ "বর্ণপরিচয়" (প্রথম ভাগ ও দ্বিতীয় ভাগ) এ তিনি প্রথম পরিকল্পিতভাবে যতি চিহ্নের ব্যবহার দেখান। এই বইটি ছিল শিশুদের বাংলা বর্ণমালা ও ভাষা শেখানোর জন্য, এবং এখানেই তিনি দাঁড়ি (।), কমা (,), সেমিকোলন (;), কোলন (:), প্রশ্নবোধক চিহ্ন (?), এবং বিস্ময় চিহ্ন (!) এর সুনির্দিষ্ট ব্যবহার প্রদর্শন করেন।
বিদ্যাসাগর তাঁর অনুবাদ এবং মৌলিক রচনাগুলোতেও ধারাবাহিকভাবে এই চিহ্নগুলো ব্যবহার করেন। "বেতাল পঞ্চবিংশতি" (১৮৪৭), "শকুন্তলা" (১৮৫৪), "সীতার বনবাস" (১৮৬০) সহ তাঁর সকল রচনায় যতি চিহ্নের সুশৃঙ্খল প্রয়োগ দেখা যায়।
যতি চিহ্নের প্রকারভেদ
বিদ্যাসাগর যেসব যতি চিহ্ন প্রচলন করেন:
দাঁড়ি বা পূর্ণচ্ছেদ (।) - বাক্যের শেষে, সম্পূর্ণ বিরতি বোঝাতে
কমা (,) - সংক্ষিপ্ত বিরতি, একাধিক বিষয় তালিকাভুক্ত করতে
সেমিকোলন (;) - কমা ও দাঁড়ির মধ্যবর্তী বিরতি
কোলন (:) - উদাহরণ বা ব্যাখ্যা শুরুর আগে
প্রশ্নবোধক চিহ্ন (?) - প্রশ্নবাচক বাক্যের শেষে
বিস্ময় চিহ্ন (!) - আবেগ, বিস্ময়, আদেশ প্রকাশে
হাইফেন (-) - দুটি শব্দ যুক্ত করতে
উদ্ধৃতি চিহ্ন (" ") - সরাসরি উক্তি বোঝাতে
গদ্য সংস্কারে বিদ্যাসাগর
যতি চিহ্ন প্রচলন শুধু একটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ছিল না, এটি ছিল বাংলা গদ্যকে পরিপক্ক করার একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ। বিদ্যাসাগরের আগে বাংলা গদ্য ছিল জটিল, দীর্ঘ বাক্যে পূর্ণ এবং সংস্কৃত প্রভাবিত। তিনি যতি চিহ্নের সাথে সাথে ছোট-মাঝারি দৈর্ঘ্যের বাক্য ব্যবহার করেন, যা পড়তে সহজ এবং বোধগম্য।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিদ্যাসাগরের গদ্যশৈলী সম্পর্কে বলেছিলেন, "বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যে সর্বপ্রথম যতি ও ছন্দের নিয়ম প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর লেখা পড়লে মনে হয় প্রতিটি শব্দ যথাস্থানে বসানো।"
সমকালীন প্রতিক্রিয়া
প্রথমদিকে অনেক রক্ষণশীল লেখক বিদ্যাসাগরের এই নতুন পদ্ধতি মানতে চাননি। তারা মনে করতেন এটি পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ। কিন্তু বিদ্যাসাগরের লেখার স্পষ্টতা এবং সাবলীলতা দেখে ধীরে ধীরে সকলেই এই পদ্ধতি গ্রহণ করেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত সহ পরবর্তী সকল লেখক বিদ্যাসাগরের প্রতিষ্ঠিত এই রীতি অনুসরণ করেন।
অন্যান্য অপশনগুলো কেন ভুল
রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩): তিনি বাংলা গদ্যের অন্যতম পথিকৃৎ এবং বাংলা সাংবাদিকতার জনক। তাঁর রচিত "সম্বাদ কৌমুদী" (১৮২১) পত্রিকা বাংলা গদ্যের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে তাঁর লেখায় যতি চিহ্নের সুসংগত ব্যবহার ছিল না। তাঁর গদ্য ছিল সংস্কৃত প্রভাবিত এবং জটিল। তিনি সমাজ সংস্কারক হিসেবে বেশি পরিচিত - সতীদাহ প্রথা রদ, ব্রাহ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠা ইত্যাদির জন্য।
কালীপ্রসন্ন সিংহ (১৮৪০-১৮৭০): তিনি মহাভারতের বঙ্গানুবাদ করেন এবং "হুতোম প্যাঁচার নকশা" রচনা করেন। তাঁর লেখায় কথ্য বাংলার ব্যবহার ছিল উল্লেখযোগ্য। তবে যতি চিহ্ন প্রচলনের কৃতিত্ব তাঁর নয়। তিনি বিদ্যাসাগরের প্রতিষ্ঠিত নিয়ম অনুসরণ করেছিলেন।
দীনবন্ধু মিত্র (১৮৩০-১৮৭৩): তিনি বাংলা নাটকের জনক এবং "নীলদর্পণ" নাটকের রচয়িতা। নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে এই নাটক লেখা হয়েছিল। তাঁর অবদান নাট্য সাহিত্যে, যতি চিহ্ন প্রচলনে নয়।
মনে রাখার কৌশল
বিদ্যাসাগর = বিরাম চিহ্ন = বর্ণপরিচয় - এই তিনটি "বি" শব্দ মনে রাখলেই যথেষ্ট। আরেকটি সহজ উপায়: "যতি" শব্দের মধ্যে "ত" আছে, "বিদ্যাসাগর" এর মধ্যেও "দ্যা" আছে - দুটোই "ত" এর কাছাকাছি ধ্বনি।
পরীক্ষায় গুরুত্ব
বিসিএস প্রিলিমিনারি, ব্যাংক জব, শিক্ষক নিবন্ধন, সরকারি-বেসরকারি চাকরির পরীক্ষায় এই প্রশ্নটি বিভিন্নভাবে আসে। কখনো সরাসরি "যতি চিহ্ন প্রচলন করেন কে?", কখনো "বর্ণপরিচয় গ্রন্থের রচয়িতা কে?", কখনো "বাংলা গদ্যের জনক কে?" - সব ক্ষেত্রেই উত্তর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।
বিদ্যাসাগর সম্পর্কে আরও মনে রাখবেন: তিনি সংস্কৃত পণ্ডিত ছিলেন, "বিদ্যাসাগর" উপাধি পেয়েছিলেন সংস্কৃত কলেজ থেকে, বিধবা বিবাহ আন্দোলনের পথিকৃৎ, নারীশিক্ষার প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।
সম্পর্কিত প্রশ্ন সমূহ
গুণহীনে ত্যাগ কর। বাক্যে নিম্নরেখ শব্দটি কোন কারকে কোন বিভক্তি?

