- হোম
- চাকরি পরীক্ষার প্রস্তুতি
প্রাক-প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ১৬.১০.২০১৫
- প্রাথমিক শিক্ষক ২০১৫
- সাধারণ জ্ঞান
নওগাঁ জেলার পাহাড়পুরে অবস্থিত 'সোমপুর বিহারের' প্রতিষ্ঠাতা কে?
পাহাড়পুরের সোমপুর মহাবিহার বা সোমপুর বিহার বাংলাদেশের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ বৌদ্ধ বিহার। এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি প্রতিষ্ঠা করেন পাল বংশের দ্বিতীয় রাজা ধর্মপাল, যিনি ৭৭০-৮১০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শাসন করেন। নওগাঁ জেলার বদলগাছী উপজেলায় অবস্থিত এই বিহারটি ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
রাজা ধর্মপাল এবং পাল সাম্রাজ্য
ধর্মপাল ছিলেন পাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা গোপালের পুত্র। পাল বংশ ছিল বাংলার ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী এবং প্রভাবশালী রাজবংশ, যারা প্রায় ৪০০ বছর (৭৫০-১১৬১ খ্রিস্টাব্দ) শাসন করেন। ধর্মপাল ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ বৌদ্ধ এবং তাঁর শাসনামলে বৌদ্ধ ধর্ম ও শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটে।
ধর্মপাল শুধু সোমপুর বিহারই নয়, বিহারের বিক্রমশীলা মহাবিহার এবং ওদন্তপুরী বিহারও প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর শাসনামলে পাল সাম্রাজ্য বিহার, বাংলা, উড়িষ্যা এবং আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তিনি ছিলেন একজন মহান পৃষ্ঠপোষক যিনি শিক্ষা, শিল্প ও সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
সোমপুর মহাবিহারের গঠন ও বৈশিষ্ট্য
সোমপুর বিহার নির্মাণ হয়েছিল অষ্টম শতাব্দীর শেষভাগে। এটি বর্গাকার পরিকল্পনায় নির্মিত, যার প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য প্রায় ৯২০ ফুট (২৮০ মিটার)। পুরো কমপ্লেক্সটি প্রায় ২৭ একর জমির উপর বিস্তৃত। বিহারের কেন্দ্রে রয়েছে একটি বিশাল ক্রুশাকৃতির মন্দির, যা প্রায় ৭০ ফুট উঁচু এবং তিন স্তরবিশিষ্ট।
বিহারটির চারপাশে ১৭৭টি কক্ষ ছিল যেখানে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বাস এবং ধ্যান করতেন। প্রতিটি কক্ষ ছিল প্রায় ১৩ ফুট বাই ১৩ ফুট আকারের। কক্ষগুলোর সামনে ছিল খোলা বারান্দা এবং মাঝখানে বিশাল খোলা উঠান। এই স্থাপত্য পরিকল্পনা বৌদ্ধ মঠ স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন।
দেয়ালে পোড়ামাটির ফলক দিয়ে অসাধারণ সব নকশা করা হয়েছিল। এসব ফলকে দেখা যায় বুদ্ধের জীবনের বিভিন্ন ঘটনা, জাতক কাহিনী, পৌরাণিক দৃশ্য, প্রাণী এবং লতাপাতার নকশা। মাটির তৈরি এসব শিল্পকর্ম পাল যুগের শিল্পকলার উৎকর্ষের প্রমাণ।
শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্ব
সোমপুর বিহার ছিল সেই সময়ের একটি আন্তর্জাতিক শিক্ষা কেন্দ্র। এখানে ভারত, চীন, তিব্বত, মায়ানমার, ইন্দোনেশিয়া সহ বিভিন্ন দেশ থেকে ভিক্ষু ও শিক্ষার্থীরা আসতেন। বৌদ্ধ দর্শন, ধর্ম, তর্কশাস্ত্র, ব্যাকরণ, চিকিৎসা শাস্ত্র, জ্যোতিষ এবং বিভিন্ন শিল্পকলা এখানে পাঠদান করা হতো।
বিখ্যাত তিব্বতীয় পণ্ডিত তারানাথের বিবরণ অনুসারে, সোমপুর বিহারে একসাথে প্রায় ৮০০০ ভিক্ষু এবং শিক্ষার্থী অবস্থান করতেন। এটি ছিল নালন্দা এবং বিক্রমশীলার মতো বিখ্যাত বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমতুল্য একটি প্রতিষ্ঠান।
প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার
১৮৭৯ সালে স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম সর্বপ্রথম এই স্থানটি চিহ্নিত করেন। ১৯২০-৩০ এর দশকে কাশীপ্রসাদ জয়সোয়াল এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে পরিকল্পিত খনন কাজ পরিচালিত হয়। এসব খননে পাওয়া যায় অসংখ্য মূর্তি, শিলালিপি, মুদ্রা, তাম্র শাসন, পোড়ামাটির ফলক এবং দৈনন্দিন ব্যবহারের সামগ্রী।
বিহারটির নামকরণ সংক্রান্ত একটি তাম্রশাসন পাওয়া গেছে যেখানে পাল রাজা দেবপালের (ধর্মপালের পুত্র) আমলে এই বিহারের উল্লেখ আছে। শিলালিপিতে উল্লেখ আছে যে ধর্মপাল এই বিহার নির্মাণ করেন এবং দেবপাল এর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিশাল ভূমি দান করেন।
পাহাড়পুর জাদুঘরে বর্তমানে এখান থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন প্রত্নসামগ্রী সংরক্ষিত আছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো বিভিন্ন ভঙ্গিমার বুদ্ধমূর্তি, বোধিসত্ত্ব মূর্তি, হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি এবং অসাধারণ শিল্পকর্মসমৃদ্ধ পোড়ামাটির ফলক।
সোমপুর বিহারের পতন
দ্বাদশ শতাব্দীর শুরুতে পাল সাম্রাজ্যের পতনের সাথে সাথে সোমপুর বিহারেরও পতন শুরু হয়। ১২০০ সালের দিকে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের সময় অনেক বৌদ্ধ মঠ ধ্বংস হয়ে যায়। ধীরে ধীরে বিহারটি পরিত্যক্ত হয় এবং মাটিচাপা পড়ে যায়। স্থানীয় মানুষ একে "পাহাড়" মনে করত, তাই নাম হয় পাহাড়পুর।
অন্যান্য অপশনগুলো কেন ভুল
রাজা বিক্রমাদিত্য: এই নামে বেশ কয়েকজন ভারতীয় রাজা ছিলেন, তবে সোমপুর বিহারের সাথে কোনো বিক্রমাদিত্যের সম্পর্ক নেই। সবচেয়ে বিখ্যাত বিক্রমাদিত্য ছিলেন উজ্জয়িনীর রাজা, যিনি খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে রাজত্ব করেন এবং তাঁর রাজ্য বাংলা থেকে বহু দূরে ছিল।
লক্ষণ সেন: তিনি ছিলেন সেন বংশের শেষ প্রধান রাজা, যিনি ১১৭৮-১২০৬ খ্রিস্টাব্দে শাসন করেন। সেন বংশ ছিল হিন্দু এবং তারা মূলত হিন্দু মন্দির নির্মাণ করতেন, বৌদ্ধ বিহার নয়। লক্ষণ সেনের সময় বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব অনেক কমে গিয়েছিল। তিনি ছিলেন বল্লাল সেনের পুত্র এবং তাঁর রাজধানী ছিল নদীয়ায়।
রাজা ধর্মসেন: এই নামের কোনো বিখ্যাত বাংলার রাজা ইতিহাসে নেই। এটি একটি বিভ্রান্তিকর অপশন যা "ধর্মপাল" নামের সাথে মিলিয়ে দেওয়ার জন্য রাখা হয়েছে। পাল বংশে ধর্মপাল ছাড়াও দ্বিতীয় ধর্মপাল ছিলেন, কিন্তু ধর্মসেন নামে কেউ ছিলেন না।
পরীক্ষায় মনে রাখার কৌশল
- সোমপুর বিহার = পাহাড়পুর = নওগাঁ = ধর্মপাল = পাল বংশ
- সময়কাল: অষ্টম শতাব্দী (৭৭০-৮১০ খ্রিস্টাব্দ)
- বিশ্ব ঐতিহ্য: ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো
- মনে রাখুন: "ধর্মপাল পাল বংশের, তাই পাহাড়পুর পাল আমলের"
বিসিএস, ব্যাংক চাকরি, প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রায় সব ধরনের সরকারি চাকরির পরীক্ষায় পাহাড়পুর সম্পর্কিত প্রশ্ন নিয়মিত আসে। বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠাতার নাম, অবস্থান, ইউনেস্কো স্বীকৃতির বছর এবং সময়কাল জানা জরুরি।
আন্তর্জাতিক প্রভাব
সোমপুর বিহারের স্থাপত্যশৈলী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মন্দির নির্মাণে প্রভাব ফেলেছে। ইন্দোনেশিয়ার বিখ্যাত বরোবুদুর মন্দির এবং মায়ানমারের বিভিন্ন বৌদ্ধ মন্দিরের সাথে সোমপুর বিহারের নকশার মিল পাওয়া যায়। এটি প্রমাণ করে যে পাল আমলে বাংলা থেকে বৌদ্ধ ধর্ম এবং সংস্কৃতি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছিল।
সম্পর্কিত প্রশ্ন সমূহ

