• হোম
  • চাকরি পরীক্ষার প্রস্তুতি

৩৪তম বিসিএস প্রিলিমিনারি ও লিখিত প্রশ্ন সমাধান ২০১৩

  • বিসিএস ২০১৩
  • বাংলাদেশ
Back

সুশাসন জনপ্রশাসনের একটি সর্বগৃহীত বৈশিষ্ট্য হিসেবে স্বীকৃত। বিষয়টি ব্যাখ্যাপূর্বক সুশাসন এর উপরে বিস্তারিত আলোচনা করুন। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের সাফল্য ব্যর্থতা এবং আপনার মতামত বর্ণনা করুন।

সুশাসন বা Good governance হচ্ছে বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে একটি ব্যাপক প্রচলিত ধারণা, যার মাধ্যমে দেশের জনগণ কিভাবে শাসিত হবে, কিভাবে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে, রাষ্ট্র ও সরকারের সম্পর্ক কেমন হবে ইত্যাদি জানা যায়। আধুনিক সরকারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বিরাজমান সকল সমস্যার সমাধান ঘটিয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। মূলত রাষ্ট্রকে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও সঠিক পরিচালনার মাধ্যমে উৎকর্ষের শীর্ষে পৌঁছে দেয়াই হচ্ছে সরকারের প্রধান কর্তব্য। সরকার যদি প্রকৃত অর্থেই জনগণের কাছে দায়িত্বশীল, দায়বদ্ধ, স্বচ্ছ ও কর্তব্যপরায়ণ থাকে তবেই সুশাসন বা Good governance কথাটি কার্যকর ও সফলতা লাভ করে।

সুশাসনের গুরুত্ব: বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের (3rd world) একটি উন্নয়নশীল দেশ। তাই বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশের জন্য সুশাসন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এসব দেশে অনুন্নয়নের কারণ শুধু জনশক্তির অভাব কিংবা সম্পদের অপ্রতুলতা নয়, বরং সুশাসনের অভাব এখানে অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করে। এখানে সুশাসনের পথে অন্তরায় হয়ে আছে বিভিন্ন বিষয়। এখানে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, আছে প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব, সাংবিধানিক শাসন ও আইনের শাসনের অনুপস্থিতি, নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী গণমাধ্যমের অভাব, বৈদেশিক শক্তি ও দাতাগোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীলতা, ব্যবসায়ী-রাজনৈতিক সিন্ডিকেট, সামাজিক ঐকমত্যের অভাব, NGO-এর নগণ্য ভূমিকা, Charismatic leader-এর অভাব এবং রাজনৈতিক দল ও নির্বাচনী ব্যবস্থায় ত্রুটি ও দুর্বল স্থানীয় সরকার কাঠামো।
সুশাসনের সংজ্ঞা: এখন পর্যন্ত বিশ্বের কোনো একাডেমিক মহল থেকে বিভিন্ন দেশের উন্নয়ন অভিজ্ঞতার আলোকে সুশাসনের কোনো গ্রহণযোগ্য ও সর্বজনীন তত্ত্ব বা সংজ্ঞা দেয়া সম্ভব হয়নি। তবে সাধারণভাবে বলা যায়, সুশাসন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যাতে দেশের সীমিত সম্পদকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করে জনগণকে অধিক সুযোগ-সুবিধা দান করা যায় বা তাদের অধিক কল্যাণ নিশ্চিত করা যায়।

Professor Dr. Ataur Rahman বলেছেন- 'Good governance implies the ability of Political system, its effectiveness, performance and quality. (BISS Journal, Vol-14, No -4, P-461, October 1993]

সুতরাং সুশাসন হচ্ছে এমন একটি কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রতিফলন যেখানে শাসক ও শাসিতের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় থাকবে, সর্বোচ্চ স্বাধীন বিচার বিভাগ থাকবে, আইনের শাসন থাকবে, নীতির গণতন্ত্রায়ন থাকবে, মানবাধিকারের নিশ্চয়তা থাকবে, সিদ্ধান্তগ্রহণে সকলের অংশগ্রহণ-মতামত ও পছন্দের স্বাধীনতা থাকবে এবং থাকবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা।

সুশাসন সম্পর্কে বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রচলিত প্রধান ২টি ধারণা আছে। ধারণা ২টি হচ্ছে-

(i) বিশ্বব্যাংকের ধারণা (World Bank View)

(ii) পশ্চিমা বিশ্বের ধারণা (Western View)।

কিন্তু সুশাসনের ধারণাটি সর্বজনীন নয় কেননা ভৌগোলিক অবস্থান, শিক্ষার হার, জীবনযাত্রার মান ও সামাজিক-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কৃতির ভিন্নতার জন্য বাংলাদেশের সুশাসন এবং পশ্চিমা বিশ্বের সুশাসনের ধরন কিছুটা ভিন্ন।

বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সম্ভাব্য করণীয়: বাংলাদেশের সুশাসন প্রতিষ্ঠাকল্পে নিম্নোক্ত পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করা যেতে পারে:

১. প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন ঔপনিবেশিক শাসনামলে ব্রিটিশরা তাদের স্বার্থ ব্যতীত কোনো আধুনিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেনি। ১৯৪৭-পরবর্তীতেও কোনো প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি হয়নি। সামরিক শাসনে রাজনৈতিক দল, প্রতিষ্ঠান, চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী এতই দুর্বল ছিল যে, আইয়ুব খান এসব প্রতিষ্ঠানকে নিজ উদ্দেশ্য সাধনে ব্যবহার করেছে। বাংলাদেশ এই দুর্বল প্রতিষ্ঠানসমূহকে নিয়ে স্বাধীনতা লাভ করে এবং ব্যাপক অর্থনৈতিক সমস্যার সম্মুখীন হয়। তাই বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন।

২. জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা (রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক): সুশাসনের পূর্বশর্ত হচ্ছে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা। জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা ২ প্রকার। যথা: রাজনৈতিক জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা। বাংলাদেশে রাজনীতি ও প্রশাসনে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। কারণ বাংলাদেশের রাজনীতি ও প্রশাসনে রয়েছে ক্ষমতার ঔদ্ধত্য ও অপব্যবহার, কর্মের দীর্ঘসূত্রিতা, লাল ফিতার দৌরাত্ম্য, পার্লামেন্টারি কমিটিগুলোর ব্যর্থতা, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব। তাই সহজেই অনুমেয় যে, বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।

৩. ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা ও স্বজনপ্রীতি পরিহার ও গণতান্ত্রিক চর্চা বৃদ্ধি: বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থায় আজ পর্যন্ত যারা নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন তাদের মধ্যে কর্তৃত্বপরায়ণতা, পিতৃতান্ত্রিকতা, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা ও স্বজনপ্রীতি পরিলক্ষিত হয় এবং নেতা ও দলের মধ্যে রয়েছে গণতান্ত্রিক চর্চা ও মূল্যবোধের অভাব। তাই এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা পরিহার করে অর্থাৎ নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ করে গণতান্ত্রিক চর্চা তথা জাতির বৃহত্তর স্বার্থ রক্ষা করতে হবে।

৪. চারিত্রিক দৃঢ়তা বৃদ্ধি ও দুর্নীতি প্রতিরোধ: বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের চারিত্রিক দুর্বলতা অত্যন্ত প্রকট। নীতির প্রশ্নে অটল থাকা, নিজের বা অন্যের প্রতি প্রদর্শিত অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হওয়া, অন্যায় নির্দেশকে অগ্রাহ্য করা, অঙ্গীকার/প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা, ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো প্রভৃতি চারিত্রিক সবলতা নেতাদের মাঝে দেখা যায় না। কার্যত এর বিপরীত অবস্থাটিই বিদ্যমান।
দুর্নীতি সুশাসনের অন্যতম প্রধান অন্তরায়। বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতি পরিলক্ষিত হয়। যেমন- প্রকল্পে দুর্নীতি, সরকারি রাজস্ব আদায়ে দুর্নীতি, সরকারি-বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি, সরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি, কাবিখা প্রকল্পে দুর্নীতি, ভূমি জরিপে দুর্নীতি, পুলিশ প্রশাসনে দুর্নীতি প্রভৃতি। অতএব বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠাকল্পে অবশ্যই ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা ও স্বজনপ্রীতি পরিহার করে গণতান্ত্রিক চর্চা বৃদ্ধি করতে হবে এবং সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে সকল ক্ষেত্রে দুর্নীতি নির্মূল করতে হবে। কেননা দুর্নীতি হচ্ছে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রধানতম অন্তরায়।

৫. বহিঃশক্তির ওপর নির্ভরশীলতা: বিদেশী শক্তি ও সাহায্যদাতা দেশগুলোর ওপর নির্ভর করে ক্ষমতা চর্চার চেষ্টা করে থাকে আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। দেশীয় রাজনৈতিক বিষয়াদিতে বিদেশী প্রভুশক্তির অনধিকার হস্তক্ষেপ তারা মেনে নেন নির্দ্বিধায়, যা আমাদের দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অন্তরায়। তাই বহিঃশক্তির প্রভাবমুক্ত সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদেরকে অর্থনৈতিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে।

৬. ব্যবসায়ী-রাজনীতিবিদ সিন্ডিকেট কঠোর হস্তে দমন সুশাসন প্রতিষ্ঠার একটি বড় অন্তরায় হচ্ছে ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ আঁতাত। ঋণখেলাপি শ্রেণী এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করছে, প্রতিনিধি নির্বাচনে অর্থের যোগান দিচ্ছে। এসব প্রতিনিধিরা অবশ্যই ব্যবসায়ীদের স্বার্থে আইন ও নীতিমালা তৈরি করে, যা সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে, অন্যদিকে এরা মাস্তান পোষে এবং আইন এদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তাই এদেরকে কঠোর হস্তে দমন করতে হবে।

৭. দাতাগোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস: রেহমান সোবহান বলেন যে, বাংলাদেশের পক্ষে এখন autonomous agent হিসেবে কাজ করা সম্ভব নয়। কারণ অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠী বহিঃচাপ বিশেষ করে দাতাগোষ্ঠীর চাপে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কোনো কাজ করতে পারে না। দেশের অর্থনীতি নির্ভর করে বিভিন্ন দেশ ও দাতাগোষ্ঠীর সাহায্যের ওপর। কাজেই কোনো নীতি নির্ধারণে তাদের মতামতকে প্রাধান্য দিতে হয়। এ অবস্থা সুশাসনের জন্য বাধাস্বরূপ। তাই বাংলাদেশেকে দাতাগোষ্ঠী কিংবা দেশের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। আর দাতাদের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হলে আমাদেরকে অর্থনৈতিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে, আর অর্থনৈতিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার জন্য রাজস্ব আয়ের টার্গেট অনুযায়ী সম্পূর্ণ আদায় করতে হবে, উন্নয়ন খাতে ব্যয় কিছুটা কমিয়ে দাতাগোষ্ঠীর কাছে হাত পাতা বন্ধ করতে হবে। তাহলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ত্বরান্বিত হবে।

৮. রাজনৈতিক ঐকমত্য সৃষ্টি: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ঐকমত্য প্রশ্নে বাধার সম্মুখীন হচ্ছে, যার ফলে আজও সমাধান হয়নি বাঙালি ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ দ্বন্দ্ব, স্থানীয় সরকার কাঠামো, পররাষ্ট্র নীতি ইত্যাদি। ফলে একেক রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকাকালীন একেক ব্যবস্থা চালু হয় যা সুশাসনের জন্য মোটেও ইতিবাচক নয় বরং হরতাল ও অবরোধের ফলে দেশের আইন-শৃঙ্খলা ও অর্থনীতি ভেঙে পড়ে, যা সুশাসনের ব্যাপারে সমস্যার সৃষ্টি করে। অতএব বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে রাজনৈতিক ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। সবার সম্মিলিত প্রয়াসে স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলতে হবে।

৯. এনজিওদের সরকারের সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালনের সুযোগ সৃষ্টি: World Bank-এর মতে, 'প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে NGO-গুলোকে স্থান দিতে হবে।' কিন্তু বাংলাদেশে শাসনের মূল দায়িত্ব সরকারের নির্বাহী বিভাগের ওপর। এখানে NGO-গুলোকে কাজ করতে হয় সরকারের নানান রকম বাধা-নিষেধের আওতায়। অর্থাৎ বাংলাদেশে NGO সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত হতে পারছে না। অথচ সুশাসনে NGO সরকারের সহযোগী এবং NGO-গুলো দেশের স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাই বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে NGO-গুলোকে তাদের ভূমিকা পালনের জন্য যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে।

১০. ক্ষমতার বৈধতা: ১৯৪৭-পরবর্তী যারা ক্ষমতায় বা নেতৃত্বে এসেছে তাদের ক্ষমতার বৈধতা নিয়ে সংকট রয়েছে। যাদের ক্ষমতা গ্রহণই প্রশ্নের সম্মুখীন তাদের দ্বারা সুশাসন কতটা সম্ভব সেটা সহজেই অনুমেয়। তাই সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বৈধ ও স্বচ্ছ সরকার চাই।

১১. ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ক্ষমতা ও সম্পদের সুষম বণ্টনের অভাবে দেশে এক শ্রেণীর লোক সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলছে আর জনগণের অপর অংশ দিনে দিনে আরও গরিব হচ্ছে। তাই বণ্টন সমস্যা সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রধানতম বাধা হয়ে কাজ করছে। তাই বলাই বাহুল্য, বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণে আশু পদক্ষেপ নিতে হবে।

১২. বিদ্যমান আইনের সংস্কার: সুশাসনের অন্যতম শর্ত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু বাংলাদেশে আইন প্রণীত হচ্ছে রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য, একদল অন্যদলকে ঘায়েল করার জন্য। আইন প্রণয়নে রয়েছে নানাবিধ সমস্যা, ফলে দেশে বিদ্যমান আইনের শাসন বিঘ্নিত হচ্ছে। অতএব সুশাসন নিশ্চিতকরণে প্রয়োজনীয় আইনগুলো সংস্কার করতে হবে।

১৩. জাতীয় সংসদকে শক্তিশালী করা: বাংলাদেশের পার্লামেন্ট কমবেশি রাবার স্ট্যাম্পে পরিণত হয়েছে। কারণ পার্লামেন্টের কাজ আইন প্রণয়ন, বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা করা হলেও Prime Minister-এর ইচ্ছানা বিরুদ্ধে কোনো আইন সংসদে গৃহীত হয় না। অতএব সুশাসনের জন্য সংসদকে শক্তিশালী করতে হবে।

১৪. রাজনৈতিক দলগুলোকে স্বচ্ছ ও শক্তিশালী করা সুশাসন চায় গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতামূলক দল ব্যবস্থা। কিন্তু বাংলাদেশে যেসব রাজনৈতিক দল রয়েছে এসব দলের প্রতিনিধিরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে জনগণকে উপেক্ষা করে। যারা দলের নেতৃত্বে আছে তারা সর্বদা নেতৃত্বেই থাকতে চায়। সিদ্ধান্তগ্রহণে দলের প্রধানের প্রাধান্য দেখা যায়। জনগণের পৃষ্ঠপোষক না হয়ে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নে গুরুত্ব দেয় যা সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অন্তরায়। তাছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোতে দলীয় কোন্দল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। ক্ষমতাসীনরা বিরোধীদের কোণঠাসা করে রাখতে ষড়যন্ত্র করে। আর বিরোধীরা সরকারকে বিপর্যস্ত করে অরাজকতা সৃষ্টিতে তৎপর। অতএব সুশাসনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোতে স্বচ্ছতা আনয়নের ব্যবস্থা করতে হবে।

১৫. স্থানীয় সরকার কাঠামো শক্তিশালীকরণ: একটি শক্তিশালী, কার্যকর, দক্ষ, স্বায়ত্তশাসিত, জনপ্রতিনিধিত্বশীল স্থানীয় সরকার সুশাসনের অন্যতম শর্ত। যে দেশে স্থানীয় সরকার কাঠামো যত শক্তিশালী ও জনপ্রতিনিধিত্বশীল, সে দেশে গণতন্ত্র ততটাই বিকশিত। অথচ বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার সময়ের বিবর্তনের সাথে সাথে নানা রূপ পরিগ্রহ করলেও কোনো পদ্ধতি কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম হয়নি। তাই স্থানীয় সরকারের হাতে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে, জবাবদিহিতার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, তবেই সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।

১৬. আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রোধ: বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের দুর্বলতার সুযোগে আমলারা কর্তৃত্বপরায়ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। প্রশাসনকে গণমুখী করতে হলে আমলাতন্ত্রের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। আর আমলাতন্ত্র তথা প্রশাসনের জবাবদিহিতা সুশাসন নিশ্চিত করে।

১৭. গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ: মানুষের বাঞ্ছাধীনতা ও জনগণের সচেতনতার জন্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অপরিহার্য। কিন্তু ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে সরকার গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করে যা সুশাসনের অন্তরায়। তাই সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকারের ত্রুটি কিংবা দুর্নীতি জনগণের সামনে উপস্থাপনের লক্ষ্যে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে স্বাধীনতা দিতে হবে।

১৮. ধর্মীয় সহিষ্ণুতা বৃদ্ধি: বাংলাদেশ সংবিধানের ৪১ নং অনুচ্ছেদে ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলা থাকলেও বিভিন্ন ধর্ম ও জাতির লোকেরা নানাভাবে অত্যাচারিত হচ্ছে এবং রাজনৈতিক কিছু দল কর্তৃক তাদের রাজনৈতিক ফায়দা লুটার জন্য ধর্মকে ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করার ফলে ক্রমেই ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি পাচ্ছে যা সুশাসনে কাম্য নয়। তাই সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ধর্মীয় সহিষ্ণুতা বৃদ্ধি করতে হবে।

১৯. বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের সর্বোচ্চ সুবিধা গ্রহণ: ১ নভেম্বর ২০০৭ সাল থেকে সংবিধানের ২২নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ আলাদা হয়েছে। এর সুফল শতভাগ আদায় করে নিতে হবে। নির্বাহী বিভাগ কোনোভাবেই যাতে এখনো বিচার বিভাগের ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে না পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য যত দ্রুত সম্ভব আইন মন্ত্রণালয় থেকে আলাদা সচিবালয় সৃষ্টি করতে হবে। যা সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়ে যাবে।

উপসংহার: বস্তুত স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ইত্যাদির মূলে রয়েছে মানুষের নৈতিকতা, সততা ও ধর্মবোধ। তাই সুশাসন প্রতিষ্ঠাকল্পে আমাদের অন্যান্য পদক্ষেপ নেয়ার পাশাপাশি সবার নৈতিক চরিত্রের উন্নতি ও দেশপ্রেম দৃঢ় করতে হবে।

শেয়ার :

সম্পর্কিত প্রশ্ন সমূহ