- হোম
- চাকরি পরীক্ষার প্রস্তুতি
প্রাক-প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ৩০.১০.২০১৫
- প্রাথমিক শিক্ষক ২০১৫
- বাংলা
'মহাপৃথিবী' কাব্যগ্রন্থ কার লেখা?
জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪) আধুনিক বাংলা সাহিত্যের এমন একজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব, যাকে বুদ্ধদেব বসু ‘নির্জনতম কবি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। ‘মহাপৃথিবী’ তাঁর চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তাল সময়ে ১৯৪৪ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। এই কাব্যগ্রন্থে কবি কেবল প্রকৃতির রূপকার হিসেবে নন, বরং যুদ্ধ-বিগ্রহ, দুর্ভিক্ষ এবং সামাজিক অস্থিরতার এক নিপুণ পর্যবেক্ষক হিসেবে ধরা দিয়েছেন।
কেন এটি সঠিক: সাহিত্যের প্রেক্ষাপট ও বিশ্লেষণ
‘মহাপৃথিবী’ কাব্যগ্রন্থটি জীবনানন্দ দাশের কবি-মানসের এক বিশাল বিবর্তনের সাক্ষী। কেন এই উত্তরটি সঠিক, তার গভীরে গেলে আমরা কয়েকটি বিষয় দেখতে পাই:
১. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ১৯৪৪ সাল ছিল বাংলার জন্য এক দুর্বিষহ সময়। একদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, অন্যদিকে পঞ্চাশের মন্বন্তর (তেতাল্লিশের আকাল)। জীবনানন্দ দাশের এই কাব্যগ্রন্থে সমকালীন সেই যাতনা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। 'আট বছর আগের একদিন' বা 'লাশকাটা ঘর'-এর মতো কবিতাগুলো এই সংকলনেই রয়েছে।
২. ভাষা ও চিত্রকল্প: জীবনানন্দ দাশের কবিতার শব্দচয়ন ছিল সমসাময়িক অন্য কবিদের চেয়ে আলাদা। তিনি ‘ধূসরতা’, ‘অন্ধকার’, ‘হিম’—এই শব্দগুলোকে এক অনন্য ব্যঞ্জনায় ব্যবহার করেছেন যা মহাপৃথিবীর প্রতিটি ছত্রে বিদ্যমান।
৩. দর্শন: এই গ্রন্থে কবি কেবল পৃথিবীর রূপ বর্ণনা করেননি, বরং মহাকালের প্রেক্ষাপটে মানুষের ক্ষুদ্রতা এবং বিপন্নতাকে ফুটিয়ে তুলেছেন। এই গভীর জীবনবোধই নিশ্চিত করে যে এটি জীবনানন্দ দাশেরই সৃষ্টি।
কেন অন্য বিকল্পগুলো ভুল?
পরীক্ষায় বা সাধারণ জ্ঞানে বিভ্রান্তি এড়াতে অন্য কবিদের সাহিত্যশৈলী সম্পর্কে জানা জরুরি:
ফররুখ আহমদ (১৯১৮-১৯৭৪): ফররুখ আহমদকে বলা হয় ‘মুসলিম রেনেসাঁর কবি’। তাঁর কবিতার প্রধান উপজীব্য ছিল ইসলামের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি। তাঁর শ্রেষ্ঠ কাজ ‘সাত সাগরের মাঝি’ বা ‘সিন্দাবাদ’। তাঁর লেখায় সিন্ধু, হেরা বা মরুভূমির যে আবহ পাওয়া যায়, তা ‘মহাপৃথিবী’র নির্জন প্রকৃতির চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাই এটি তাঁর হওয়ার কোনো অবকাশ নেই।
গোলাম মোস্তফা (১৮৯৭-১৯৬৪): তিনি মূলত একজন আদর্শবাদী কবি ও জীবনীকার। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ ‘বিশ্বনবী’ (রাসূল সা.-এর জীবনী)। তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘হাস্নাহেনা’ বা ‘সাহারা’র ভাষা ছিল অনেক বেশি ছন্দোবদ্ধ এবং সরাসরি। জীবনানন্দ দাশের মতো বিমূর্ত ভাবধারা বা পরাবাস্তববাদী চেতনা তাঁর লেখায় অনুপস্থিত ছিল।
জসীমউদ্দীন (১৯০৩-১৯৭৬): জসীমউদ্দীনকে আমরা ‘পল্লীকবি’ হিসেবে চিনি। তাঁর কবিতার মূল বিষয়বস্তু ছিল বাংলার গ্রাম, কৃষক, মাঠ এবং পল্লীর সহজ-সরল জীবন। ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ বা ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ পড়লে যে মেঠো গন্ধ পাওয়া যায়, জীবনানন্দের নাগরিক জটিলতা ও বিপন্ন বিস্ময়ের সাথে তার কোনো মিল নেই।
ব্যাকরণ ও ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
‘মহাপৃথিবী’ শব্দটি নিয়ে আমরা কিছু ব্যাকরণগত আলোচনা করতে পারি, যা আপনার পরীক্ষার প্রস্তুতিতে কাজে দেবে:
১. সন্ধি বিচ্ছেদ: মহাপৃথিবী = মহা + পৃথিবী।এটি একটি স্বরসন্ধি। নিয়মটি হলো: আ+ঋ=আ-কার এবং ঋ-কার অবিকৃত থাকে (সংস্কৃত ব্যাকরণ অনুযায়ী মহৎ শব্দের উত্তরপদ হিসেবে মহা ব্যবহৃত হয়)।
২. সমাস নির্ণয় : ‘মহাপৃথিবী’ শব্দটি কর্মধারয় সমাসের অন্তর্গত। ব্যাস বাক্য: মহতী যে পৃথিবী = মহাপৃথিবী।এখানে ‘মহতী’ বিশেষণ এবং ‘পৃথিবী’ বিশেষ্য। যখন বিশেষণের সাথে বিশেষ্যের মিলন ঘটে এবং বিশেষ্যের অর্থই প্রধান থাকে, তাকে কর্মধারয় সমাস বলে।
অতিরিক্ত তথ্য ও মূল্য সংযোজন (Value Addition)
আপনি যেহেতু অতিরিক্ত তথ্যের মাধ্যমে জ্ঞানের গভীরতা বাড়াতে পছন্দ করেন, তাই নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হলো:
১. বেদব্যাসের জন্মবৃত্তান্ত ও মহাপৃথিবীর সংযোগ: আপনি আগের প্রশ্নে কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের কথা বলেছিলেন। হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, যমুনা নদীর এক দ্বীপে (দ্বীপায়ন) সত্যবতী ও পরাশর মুনি'র মিলনে তাঁর জন্ম। তাঁর শরীরের রং কৃষ্ণ (কালো) ছিল বলে তাঁর নাম কৃষ্ণদ্বৈপায়ন। তিনি যেমন বিশাল ভারতের ইতিহাসকে ‘মহাভারত’ কাব্যে রূপ দিয়েছেন, জীবনানন্দ দাশও তেমনি বাংলার আধুনিকতাকে ‘মহাপৃথিবী’র ফ্রেমে বন্দি করেছেন। দুজনেই নিজ নিজ সময়ের ‘বিপন্নতা’ এবং ‘ধর্ম’ (বা আদর্শের বিচ্যুতি) নিয়ে লিখেছেন।
২. জীবনানন্দ দাশের উপাধি ও মৃত্যু: তাঁকে ‘রূপসী বাংলার কবি’ বলা হলেও তাঁর মৃত্যুর পর আবিষ্কৃত হয়েছে তাঁর অসংখ্য উপন্যাস ও ছোটগল্প, যা তাঁর জীবদ্দশায় অপ্রকাশিত ছিল। ১৯৫৪ সালে কলকাতার বালিগঞ্জে এক ট্রাম দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়, যা বাংলা সাহিত্যের এক করুণ অধ্যায়।
৩. সমসাময়িক প্রকাশনা: ১৯৪৪ সালে যখন ‘মহাপৃথিবী’ প্রকাশিত হয়, তখন কবি চরম অর্থকষ্টে ভুগছিলেন। এই কাব্যগ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছিল তাঁর বন্ধু ‘অপূর্বকুমার চন্দ’কে।
‘মহাপৃথিবী’ কেবল একটি বইয়ের নাম নয়, এটি বাংলা কবিতায় আধুনিকতার এক বাঁক বদলের দলিল। জীবনানন্দ দাশের এই সৃষ্টি আমাদের শেখায় কীভাবে চারপাশের অন্ধকার সময়ের মধ্যেও কবিতার আলো জ্বেলে রাখা যায়।
সম্পর্কিত প্রশ্ন সমূহ

