- হোম
- চাকরি পরীক্ষার প্রস্তুতি
প্রাক-প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ১৬.১০.২০১৫
- প্রাথমিক শিক্ষক ২০১৫
- সাধারণ জ্ঞান
গম্ভীরা গানের উৎপত্তি কোথায়?
গম্ভীরা বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রাচীন এবং স্বতন্ত্র লোকগীতি ও নৃত্যশৈলী। এর উৎপত্তিস্থল হলো চাপাইনবাবগঞ্জ জেলা, বিশেষত চাপাইনবাবগঞ্জ সদর এবং শিবগঞ্জ উপজেলা। এই অঞ্চলের মানুষের জীবন, সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে গম্ভীরা গান ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যদিও পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলাতেও গম্ভীরা গানের চর্চা আছে, তবে এর মূল উৎস এবং প্রাণকেন্দ্র চাপাইনবাবগঞ্জ।
গম্ভীরা নামের উৎপত্তি
"গম্ভীরা" শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হলো এটি "গম্ভীর" শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ গভীর বা গাম্ভীর্যপূর্ণ। হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী ভগবান শিবের একটি রূপ "গম্ভীর" নামে পরিচিত। এই গম্ভীর দেবতার পূজা উপলক্ষে যে গান ও নৃত্য পরিবেশিত হতো, সেখান থেকেই গম্ভীরা গানের সূত্রপাত বলে মনে করা হয়।
আরেকটি মত অনুযায়ী, "গম্ভীরা" শব্দটি এসেছে "গম্ভীর রস" থেকে, যা সংস্কৃত নাট্যশাস্ত্রের একটি রস তত্ত্ব। এই রসের বৈশিষ্ট্য হলো গাম্ভীর্যপূর্ণ, গভীর এবং চিন্তাশীল বিষয়বস্তু উপস্থাপন।
ঐতিহাসিক পটভূমি
গম্ভীরা গানের ইতিহাস প্রায় চার-পাঁচশো বছরের পুরনো বলে ধারণা করা হয়। তবে সঠিক সময়কাল নির্ধারণ করা কঠিন। ঐতিহাসিকদের মতে, মধ্যযুগে বরেন্দ্র অঞ্চলে (যার অন্তর্ভুক্ত বর্তমান চাপাইনবাবগঞ্জ) শৈব ধর্মের প্রভাব ছিল প্রবল। শিবের পূজা উপলক্ষে বিশেষ করে চৈত্র সংক্রান্তিতে যে লোকানুষ্ঠান হতো, সেখান থেকেই গম্ভীরা গানের জন্ম।
প্রাথমিকভাবে এটি ছিল সম্পূর্ণ ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান। শিব-পার্বতীর কাহিনী নিয়ে গান রচিত হতো। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এর বিষয়বস্তু সম্প্রসারিত হয়েছে এবং সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ও এতে স্থান পেয়েছে।
গম্ভীরা গানের বৈশিষ্ট্য
গম্ভীরা মূলত একটি সংলাপধর্মী গান। এতে দুটি চরিত্র থাকে - নানা (দাদা) এবং নাতি (নাতনি)। নানা চরিত্রটি সাধারণত জ্ঞানী, অভিজ্ঞ এবং সমাজ সচেতন। নাতি চরিত্রটি কৌতূহলী এবং প্রশ্নকর্তা। দুজনের মধ্যে সংলাপের মাধ্যমে সমাজের নানা সমস্যা, অসংগতি, দুর্নীতি, রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরা হয় ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের মাধ্যমে।
গম্ভীরা গানের আরেকটি বিশেষত্ব হলো এর সুর ও তাল। এতে ব্যবহৃত হয় ঢোল, মন্দিরা, করতাল এবং হারমোনিয়াম। গানের সুর গভীর এবং ভারী ধরনের, যা শোনামাত্রই আলাদা করে চেনা যায়।
পরিবেশনা পদ্ধতি
ঐতিহ্যগতভাবে গম্ভীরা গান পরিবেশিত হয় চৈত্র মাসের শেষ ১৫ দিন, বিশেষত চৈত্র সংক্রান্তির সময়। এই সময়টাকে "গম্ভীরা মেলার" সময় বলা হয়। মেলায় বিভিন্ন দল প্রতিযোগিতা করে। শিল্পীরা বিশেষ পোশাক পরিধান করেন। নানা চরিত্রে সাদা ধুতি, সাদা শার্ট এবং মাথায় টুপি থাকে। মুখে সাদা দাড়ি এঁকে বয়স্ক চেহারা ফুটিয়ে তোলা হয়। নাতি চরিত্রে রঙিন পোশাক এবং মুখে নানা রঙের প্রসাধনী ব্যবহার করা হয়।
গম্ভীরা পরিবেশনা শুরু হয় "গম্ভীরা ঘর" বা "শিব মন্দির" থেকে। প্রথমে দেবতার উদ্দেশ্যে প্রার্থনা সংগীত গাওয়া হয়, যাকে বলা হয় "আগমনী গান"। এরপর শুরু হয় মূল পরিবেশনা।
গম্ভীরার বিষয়বস্তু
আধুনিক গম্ভীরা গানে সমাজের যেকোনো সমসাময়ক বিষয় স্থান পায়। দুর্নীতি, মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, রাজনৈতিক অস্থিরতা, শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা, স্বাস্থ্যসেবার অভাব - সব কিছুই গম্ভীরার বিষয়বস্তু হতে পারে। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট এবং সমাজের অসংগতি তুলে ধরা হয় রসাত্মক ভঙ্গিতে, যা খুবই কার্যকর।
উদাহরণস্বরূপ, ২০১০ সালে যখন চালের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছিল, তখন গম্ভীরা গানে নানা-নাতির সংলাপে এভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল:
নাতি: নানা, চাল এত দামি ক্যান?
নানা: বাপরে, চাল তো এখন সোনার থেকেও দামি! যে চাল কিনতে পারে, সে আর ভাত খায় না, সাজিয়ে রাখে!
এমন ব্যঙ্গাত্মক উপস্থাপনা দর্শকদের হাসায়, সাথে সাথে চিন্তিতও করে।
অন্যান্য অপশনগুলো কেন ভুল
মালদহ: পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলাতেও গম্ভীরা গানের চর্চা রয়েছে। কারণ ভৌগোলিকভাবে মালদহ এবং চাপাইনবাবগঞ্জ পাশাপাশি অবস্থিত এবং একই সাংস্কৃতিক অঞ্চলের অংশ। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের আগে এই পুরো অঞ্চল একই ছিল। তাই মালদহেও গম্ভীরা জনপ্রিয়। তবে গম্ভীরার মূল উৎস এবং সবচেয়ে শক্তিশালী ঐতিহ্য চাপাইনবাবগঞ্জেই রয়েছে।
দিনাজপুর: দিনাজপুর অঞ্চলে গম্ভীরা গানের চর্চা নেই বললেই চলে। এই অঞ্চলের নিজস্ব লোকসংগীত হলো "ভাওয়াইয়া"। ভাওয়াইয়া গান রংপুর, দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম এলাকার বিখ্যাত লোকসংগীত, যা মূলত প্রেম, বিরহ এবং নিসর্গ নিয়ে রচিত।
রংপুর: রংপুরও গম্ভীরা গানের উৎসস্থল নয়। রংপুর অঞ্চলের প্রধান লোকগীতি হলো ভাওয়াইয়া, যা দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী এবং রংপুর জেলা জুড়ে জনপ্রিয়। এছাড়া রংপুরে "চটকা গান" নামে আরেক ধরনের লোকসংগীত রয়েছে।
গম্ভীরার বর্তমান অবস্থা
আধুনিক বিনোদন মাধ্যমের প্রসারের সাথে সাথে গম্ভীরা গান কিছুটা বিপন্ন হয়ে পড়েছে। নতুন প্রজন্ম এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পমাধ্যমে তেমন আগ্রহী নয়। তবে চাপাইনবাবগঞ্জে এখনও প্রতি বছর চৈত্র মাসে গম্ভীরা মেলা অনুষ্ঠিত হয় এবং অনেক দল অংশগ্রহণ করে।
সরকার এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন গম্ভীরা সংরক্ষণে কাজ করছে। বাংলাদেশ শিল্পকলা অ্যাকাডেমি নিয়মিত গম্ভীরা প্রশিক্ষণ কর্মশালা আয়োজন করে। টেলিভিশনেও মাঝে মাঝে গম্ভীরা গান প্রচারিত হয়। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো গম্ভীরাকে "অপ্রাতিষ্ঠানিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য" হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য প্রস্তাব করা হয়েছিল।
বিখ্যাত গম্ভীরা শিল্পী
চাপাইনবাবগঞ্জের বেশ কিছু শিল্পী গম্ভীরা গানকে জীবিত রেখেছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন: রশিদ উদ্দিন, আব্দুল জব্বার, মো. জাহাঙ্গীর আলম, শিতল চন্দ্র রায় প্রমুখ। এসব শিল্পী দেশে-বিদেশে গম্ভীরা গান পরিবেশন করে এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।
পরীক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
বিসিএস, প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ, ব্যাংক জব এবং অন্যান্য সরকারি চাকরির পরীক্ষায় বাংলাদেশের লোকসংগীত থেকে প্রশ্ন আসে। গম্ভীরা সম্পর্কে মনে রাখুন:
- উৎপত্তিস্থল: চাপাইনবাবগঞ্জ
- চরিত্র: নানা ও নাতি
- সময়: চৈত্র মাস, বিশেষত চৈত্র সংক্রান্তি
- বিষয়বস্তু: সামাজিক সমস্যা, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ
- বাদ্যযন্ত্র: ঢোল, মন্দিরা, করতাল, হারমোনিয়াম
এছাড়াও মনে রাখবেন অন্যান্য জেলার লোকসংগীত:
- রংপুর/দিনাজপুর: ভাওয়াইয়া
- সিলেট: বিচ্ছেদী গান, জারি গান
- ময়মনসিংহ: ভাটিয়ালি, মৈমনসিংহ গীতিকা
- নেত্রকোনা: লোকগীতিকা
- চট্টগ্রাম: মাইজভাণ্ডারী গান
সাংস্কৃতিক গুরুত্ব
গম্ভীরা শুধু একটি গান নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ তাদের মতামত প্রকাশ করে, সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। এটি গণমাধ্যমের একটি ঐতিহ্যবাহী রূপ যা আজও প্রাসঙ্গিক।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই গম্ভীরা। এটি সংরক্ষণ করা মানে আমাদের শেকড়ের সাথে সংযুক্ত থাকা, আমাদের পূর্বপুরুষের ঐতিহ্যকে সম্মান করা।
সম্পর্কিত প্রশ্ন সমূহ

