• হোম
  • একাডেমি
  • সাধারণ
  • একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
  • হিটলার ও মুসোলিনীর উত্থান
হিটলার ও মুসোলিনীর উত্থান

পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।

Back

হিটলার ও মুসোলিনীর উত্থান

জার্মানিতে হিটলারের উত্থানের কারণ

১। অর্থনৈতিক মন্দা: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে জার্মানির অর্থনীতি ছিল বিধ্বস্ত। এই বিধ্বস্ত অর্থনীতি নিয়ে মিত্রপক্ষের ক্ষতিপূরণের একটা অংশ পরিশোধ, ভার্সাই সন্ধির মাধ্যমে জার্মানির খনিজপ্রধান অঞ্চলগুলো কেড়ে নেওয়া এবং ফ্রান্স কর্তৃক রুহর দখল ইত্যাদি জার্মান অর্থনীতির উপর প্রচণ্ড প্রভাব ফেলে এবং জার্মানিতে তীব্র অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়। জার্মান মার্কের মূল্য আশ্চর্যজনকভাবে নিম্নগামী হয়। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, বেকারত্ব, উৎপাদন হ্রাস, করের বোঝায় জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির সীমিত আয় ও সঞ্চয় বিনষ্ট হওয়ায় তাদের জীবনধারণ অসম্ভব হয়ে পড়ে। এদিকে, ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দ থেকে শুরু হওয়া বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা জার্মানির অর্থনৈতিক সংকটকে দীর্ঘস্থায়ী করে। প্রজাতান্ত্রিক সরকার মন্দা থেকে উত্তরণে করণীয় দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করলেও তারা তেমন কোনো আশার সঞ্চার করতে পারেনি। নাৎসিরা একে সরকারের দুর্বলতা বলে প্রচার করে এবং আর্থসামাজিক ব্যবস্থার উত্তরণে সকল শ্রেণির স্বার্থে সংস্কার সাধনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিজেদের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করে, যা হিটলার বা নাৎসিদের উত্থানের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

২। জার্মান জাতীয়তাবাদের তীব্রতা: জার্মানরা ছিল প্রচণ্ডভাবে জাতীয়তাবাদী। তাই ভার্সাই সন্ধির মাধ্যমে জার্মান জাতির প্রতি যে অপমানজনক শর্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল তা তারা কখনো মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারেনি। তারা এর জন্য বিদেশি শক্তিগুলোর পাশাপাশি প্রজাতান্ত্রিক সরকারকে দায়ী বলে মনে করে। তারা সময়ের অপেক্ষায় ছিল। হিটলার নাৎসিবাদ থেকে সৃষ্ট জার্মানদের জাতীয়তাবাদী চেতনাকে কাজে লাগান। এ সময় তার প্রচারণা ও বক্তব্যের বিষয়বস্তু ছিল- জার্মানরাই পৃথিবী শ্রেষ্ঠ আর্য বংশোদ্ভূত। তাই অনার্যদের জার্মান থেকে বহিষ্কার করতে হবে। জার্মান জাতির হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার ইত্যাদির প্রতিশ্রুতি দিয়ে হিটলার জার্মান জাতীয়তাবাদকে জাগ্রত করে নিজের ও নাৎসি পার্টির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করেন, যা তার উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৩। কমিউনিজমভীতি: অর্থনৈতিক সংকটের কারণে জার্মানিতে কমিউনিস্টদের প্রভাব বৃদ্ধি এবং কমিউনিস্ট রাশিয়ার সাথে জার্মানির 'র‍্যাপাল্লোর' চুক্তি স্বাক্ষর জার্মান শিল্পপতিদের মনে কমিউনিজমভীতির জন্ম দেয়। কমিউনিস্টদের প্রতি প্রজাতান্ত্রিক সরকারের দুর্বলতা ও সহনশীল নীতি জার্মান শিল্পপতিদের হতাশ করে। ফলে তারা একজন কমিউনিজমবিরোধী লৌহমানবের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। হিটলার এ সময় সমাজতন্ত্রীদের প্রবল বিরোধিতা করে নিজেকে সমাজতন্ত্রবাদের শত্রু বলে প্রচার করেন। নাৎসি গুপ্তবাহিনী SA ও SS দ্বারা সমাজতন্ত্রীদের বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও ধর্মঘট ভেঙে দেওয়া হয়। এতে হিটলার সমাজতন্ত্রবিরোধীদের ও শিল্পপতিদের সমর্থন লাভ করেন। বুর্জোয়া শ্রেণির সমর্থন হিটলারের ক্ষমতালাভে যথেষ্ট সাহায্য করে।

৪। ইহুদিবিদ্বেষ: জার্মানিতে ইহুদিবিদ্বেষ ছিল বহু প্রাচীন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে তা আরও বৃদ্ধি পায়। হিটলার ইহুদিদের জার্মানির সকল বিপর্যয়ের জন্য দায়ী বলে প্রচার করতে থাকেন। সুদের কারবারি ও মুনাফাখোর বলে তাদের হেয় করতে থাকেন। মূলত ইহুদিরা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করত এবং শিল্প-কারখানার মালিকানা তাদের ছিল। ইহুদিবিদ্বেষ জার্মানির মজ্জাগত ছিল বলে তার প্রচার ও অভিযোগ জার্মানরা খুব সহজেই গ্রহণ করে, যা তার ও নাৎসিদের উত্থানে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

৫। প্রজাতান্ত্রিক সরকারের সাংবিধানিক ত্রুটি-বিচ্যুতি: প্রজাতান্ত্রিক সরকারের অধীনে প্রণীত জার্মানির সংবিধানের ৪৮ নম্বর ধারায় প্রেসিডেন্টকে কিছু বাড়তি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। যেমন-প্রয়োজনবোধে সংবিধান স্থগিত করা ও জরুরি অবস্থা ঘোষণা। কিন্তু প্রেসিডেন্টের চারিত্রিক দুর্বলতার কারণে এর অপব্যবহার শুরু হয়। দ্বিতীয়ত প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল হিন্ডেনবার্গ ছিলেন আশি বছরের বৃদ্ধ। তার শাসনামলে তিনি বয়সের কারণে অনেক সময় ক্ষমতার অপব্যবহার করেন, যার সুযোগ পুরোমাত্রায় গ্রহণ করে নাৎসিরা।

৬। প্রজাতন্ত্রবিরোধী শক্তি যুদ্ধোত্তর জার্মান রাজনীতিতে সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাম ও ডানপন্থি দলগুলো ছিল অন্যতম। ডানপন্থিদের মধ্যে অধিকাংশ সদস্য ছিলেন সামরিক বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, যাদের প্রজাতন্ত্রের প্রতি কোনো আনুগত্য ছিল না। বাম দলগুলোর প্রজাতন্ত্রের প্রতি যে ধরনের আনুগত্য থাকা প্রয়োজন ছিল, তা ছিল না। বাম স্পার্টকিস্টরা ছিল চরমভাবে প্রজাতন্ত্রবিরোধী। যদিও তারা নাৎসি তৎপরতার মুখে প্রজাতন্ত্রকে সমর্থন দিয়েছিল। হিটলারের বিয়ার হল আক্রমণ প্রজাতন্ত্রবিরোধী তৎপরতারই অংশ। তাছাড়া রাষ্ট্রীয় সৈন্যবাহিনীর মধ্যেও প্রজাতান্ত্রিক সরকারের প্রতি কোনো আনুগত্য ছিল না, যা হিটলার ও নাৎসিদের উত্থানকে ত্বরান্বিত করেছিল।

৭। হিটলারের সহযোগীদের ভূমিকা হিটলারের উত্থানের 'পেছনে তার সহযোগী গ্রেগর স্টেসার, ওট্রোস্ট্রেসার, আনটেস্ট্র-রম, হেইনরিখ হিমলার, হারমান গোরিং পল, যোসেফ গোয়েবল্স, আলফ্রেড রোজেনবার্গ প্রমুখ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। গোরিং ও হিমলার বিরুদ্ধবাদীদের দমন এবং গোয়েবল্স নাৎসি প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। প্রচারণার ক্ষেত্রে গোয়েবল্স এমনভাবে মিথ্যাচারের আশ্রয় নিতেন, যা শুনে মানুষ ভুলে গিয়েছিল যে, তার প্রচারণায় মিথ্যা বলে কিছু থাকতে পারে।

৮। জার্মান জাতির প্রজাতান্ত্রিক রীতিনীতির ঐতিহ্য না থাকা: জার্মানির পূর্বের ইতিহাস গণতান্ত্রিক শাসনের ইতিহাস নয়। তারা বরাবরই একনায়কের অধীনে শাসিত হতে হতে একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। তাই প্রজাতান্ত্রিক শাসনাধীনে এসে যুদ্ধ ও ভার্সাই সন্ধির কারণে বিধ্বস্ত জার্মানির অসুবিধাগুলোকে প্রজাতান্ত্রিক শাসনের দুর্বলতা বলেই মনে করে, যা হিটলারের উত্থানে সহায়ক হয়।

৯। হিটলারের ব্যক্তিগত যোগ্যতা অবশ্য তার উত্থানে তার যোগ্যতাকে অস্বীকার করা যায় না। একজন সুদক্ষ মনোবিজ্ঞানী ও চতুর গণবক্তা হিসেবে হিটলার জার্মান জাতির বিশেষভাবে যুব সম্প্রদায়ের মনোভাব ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি সমগ্র জাতির দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অভিযোগ ও চেতনাবোধকে অগ্নিঝরা বক্তব্যের মাধ্যমে কাজে লাগিয়ে পুরো জাতিকে তার প্রতি সম্মোহিত করে তোলেন এবং তাদের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার পথ প্রশস্ত করেন।

সম্পর্কিত প্রশ্ন সমূহ