• হোম
  • একাডেমি
  • সাধারণ
  • একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
  • হিটলার ও মুসোলিনীর উত্থান
হিটলার ও মুসোলিনীর উত্থান

পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।

Back

হিটলার ও মুসোলিনীর উত্থান

হিটলার ও মুসোলিনির কর্মকাণ্ডের তুলনা

হিটলার ও মুসোলিনি বিংশ শতাব্দীর বিশ্ব ইতিহাসের দুই ভয়ানক ও হঠকারী চরিত্র। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের ইউরোপীয় ইতিহাস তাদের ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে। উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকের ইউরোপীয় ইতিহাসের নানামুখী জটিল সমীকরণ তাদের উত্থানের পটভূমি তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। তাদের উত্থান চমকপ্রদ, কিছুটা নাটকীয়, তবে আকস্মিক নয়। এজন্য তাদের উত্থানের পটভূমি আছে, আছে প্রেক্ষাপট, কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই। উভয়ের কর্মকাণ্ডের তুলনা করতে হলে তাদের রাজনৈতিক দর্শন, একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পটভূমি, তাদের অভ্যন্তরীণ নীতি, তাদের গৃহীত পররাষ্ট্রনীতি, মূল লক্ষ্য ইত্যাদির সংক্ষিপ্ত বিচার-বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

মুসোলিনির জন্ম ১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দে ইতালির এক সাধারণ পরিবারে। পিতা ছিলেন কর্মকার। শৈশব কেটেছে দৈন্যদশায়। শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু। কিন্তু সামরিক প্রশিক্ষণের ভয়ে দেশান্তরী, পরবর্তীকালে দেশে এসে সমাজতন্ত্রী দলে যোগদান এবং দলীয় পত্রিকা অভান্তির সম্পাদক হিসেবে দ্বিতীয় কর্মজীবন শুরু।

অপরদিকে হিটলারের জন্ম ১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দে। পিতা ছিলেন অস্ট্রিয়া সরকারের এক সাধারণ কর্মচারী। চরম দরিদ্রতার মধ্য দিয়ে তার শৈশব কেটেছে। রাজনীতির প্রতি তার আকর্ষণ শৈশব থেকেই। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে এক সাধারণ সৈনিক হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু।

কাজেই জন্মগত, বিত্তগত দিক দিয়ে তারা উভয়ই ছিলেন ইউরোপীয় শ্রেণিবৈষম্যের শেষ ঠিকানা অর্থাৎ তৃতীয় শ্রেণির উত্তরাধিকার। শ্রেণিবৈষম্যগত কারণে তাদের মধ্যে উচ্চবিত্তের প্রতি ক্রোধের উদ্রেক হয়।

মুসোলিনি ভার্সাই সন্ধিকে দেখেছেন ইতালির অপ্রাপ্তির এক নাটক হিসেবে। এটা গ্রহণ করেছেন হতাশচিত্তে। তৎকালীন ইতালীয় সমাজ ও রাজনীতির নানা মিথস্ক্রিয়ায় তার মধ্যে জন্ম নেয় উগ্র জাতীয়তাবাদ ও কমিউনিজমভীতি।

হিটলার ভার্সাই সন্ধিকে দেখেছেন ক্রোধ দিয়ে, গ্রহণ করেছেন প্রতিশোধের অঙ্গীকার নিয়ে। ফলে তার মধ্যেও উগ্র জাতীয়তাবাদের উন্মেষ হয়। হিটলার বিশ্বাস করতেন, জার্মানিতে কমিউনিস্ট বিপ্লব আসন্ন এবং জার্মানির দুর্গতির জন্য ইহুদিরাই দায়ী। তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা ছিল সাম্যবাদী এবং ইহুদি। ইহুদিদের নিয়ন্ত্রণে ছিল জার্মানির সকল শিল্পপ্রতিষ্ঠান। ফলে তার মধ্যে মার্কস ও ইহুদিবিদ্বেষের উদ্ভব হয়।

মুসোলিনি যুদ্ধফেরত বিক্ষুব্ধ, হতাশ সৈনিক ও বেকার যুবকদের নিয়ে গঠন করেন আধাসামরিক বাহিনী ফ্যাসিস্ট। ল্যাটিন Fascio (দল, গুচ্ছ, অন্য অর্থে বল বা শক্তি) শব্দ থেকে এরূপ নামকরণ। ফ্যাসিবাদ মূলত একটি স্বতন্ত্র বিশ্বাস, যাতে ব্যক্তিসত্তার কোনো মূল্য নেই। এর মূলমন্ত্র 'রাষ্ট্রই সকল ক্ষমতার আধার'। এর কোনো সামাজিক দর্শন ছিল না। এটি ছিল মূলত নেতিবাচক চিন্তাধারা। ব্যক্তি রাষ্ট্রের প্রয়োজনে কাজ করতে বাধ্য। রাষ্ট্রের বাইরে ব্যক্তির কোনো অস্তিত্ব নেই। শৃঙ্খলা রক্ষা করা পবিত্র দায়িত্ব, ভঙ্গ করা রাষ্ট্রদ্রোহ। এটিই ছিল ফ্যাসিবাদের মূলমন্ত্র। ফ্যাসিস্টদের পোশাক ছিল কালো প্যান্ট-শার্ট ও কালো টুপি।

অপরদিকে হিটলার জার্মান শ্রমিক দলে যোগ দিয়ে এর নতুন নামকরণ করেন 'ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি' বা সংক্ষেপে নাৎসি দল। মূলত এটা ছিল ফ্যাসিস্ট দলের জার্মান সংস্করণ। দলের আদর্শ ছিল হিংস্রতা। আরও আদর্শ ছিল- জার্মানি একটি জাতি, একটি দল, এক নেতার আদর্শে বিশ্বাসী। জার্মানরা শ্রেষ্ঠ রক্ত আর্যদের বংশধর। অর্থাৎ বর্ণবৈষম্য ছিল নাৎসি দলের প্রধান বৈশিষ্ট্য। হিটলার জার্মানিতে এক সর্বগ্রাসী সামাজিক বিশ্বাস তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এর মূলে ছিল হিটলারের 'আমার সংগ্রাম' ও তার বাগ্মিতা। নাৎসিদের পোশাক ছিল বাদামি রঙের।

কাজেই উভয়ের কর্মপন্থা ছিল নীতিবিবর্জিত ও বলপ্রয়োগের দ্বারা রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখল। যদিও সংগঠক হিসেবে মুসোলিনি হিটলারের চেয়ে অগ্রসর ছিলেন, কিন্তু হিংস্রতা ও উগ্রতায় এগিয়ে ছিলেন হিটলার, যার মূলে ছিল তার গেস্টাপো ও ঝটিকা বাহিনী। মুসোলিনির ফ্যাসিবাদের দর্শনের চেয়ে নাৎসিবাদের সামাজিক দর্শন ছিল অনেক গভীরে প্রোথিত। মুসোলিনি নীতিহীন ও একনায়কতন্ত্রে বিশ্বাসী। তাই বলে হিটলার মোটেও নীতিবান ছিলেন না। বরং হিটলার ছিলেন মুসোলিনির চেয়ে চতুর ও ভালো মনোবিজ্ঞানী।

অভ্যন্তরীণ নীতিতে মুসোলিনির সাফল্য হচ্ছে ইতালির অর্থনীতির পুনর্গঠন, রাজস্বব্যবস্থার আধুনিকায়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে তার উৎসাহ ছিল। ম্যালেরিয়ার প্রকোপ থেকে দেশের মানুষকে রক্ষা, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি এবং আধুনিক সামরিক বাহিনী গঠন তার কৃতিত্বের অন্তর্ভুক্ত। উক্ত কর্মকাণ্ডের ফলে ইতালীয়দের কাছে তিনি গ্রহণযোগ্য নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

অপরদিকে হিটলার বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. শাখটের সাহায্যে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন করে জার্মানিতে উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হন। জার্মানিতে বেকারের সংখ্যা ষাট লাখ থেকে কমিয়ে দশ লাখে নিয়ে আসা তার উল্লেখযোগ্য সাফল্য। খাদ্যে, শিল্পে ও অস্ত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের মধ্য দিয়ে তিনি জার্মানির আস্থাভাজন নেতায় পরিণত হন।

মুসোলিনির পররাষ্ট্রনীতির উদ্দেশ্য ছিল মূলত ভূমধ্যসাগরে প্রাধান্য বিস্তার ও উপনিবেশ স্থাপন। এগুলো বাস্তবায়নে তার নির্দিষ্ট কোনো কৌশল ছিল না। গণতান্ত্রিক রীতি-নীতি ও আন্তর্জাতিক মতামতকে চরম উপেক্ষা করে জঙ্গিবাদী নীতির বাস্তবায়নই ছিল তার পররাষ্ট্রনীতির মূল বৈশিষ্ট্য।

অপরদিকে হিটলারের পররাষ্ট্রনীতির উদ্দেশ্য ছিল ভার্সাই সন্ধির শর্তসমূহ লঙ্ঘন করে ইউরোপে জার্মানিকে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করা, জার্মান ভাষাভাষী অঞ্চল নিয়ে বৃহত্তর জার্মান রাষ্ট্র গঠন। লক্ষ্য বাস্তবায়নে তার কৌশল ছিল প্রতিপক্ষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি, ভীতির উদ্রেক, একটি দাবি পূরণের সাথে সাথে আরেকটি উত্থাপন। দাবি পূরণ না হলে যুদ্ধের মাধ্যমে আদায়।

কাজেই উভয়ের গৃহীত পররাষ্ট্রনীতির কৌশলে সাদৃশ্য না থাকলেও লক্ষ্যে সাদৃশ্য ছিল। অর্থাৎ যুদ্ধের মাধ্যমে লক্ষ্য বাস্তবায়ন। যুদ্ধবাজ এ দু'নেতার কর্মকাণ্ডই পৃথিবীতে আরেকটি বিয়োগান্ত দৃশ্যের অবতারণা করে। অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উদ্ভব ঘটে।

সম্পর্কিত প্রশ্ন সমূহ