- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- হিটলার ও মুসোলিনীর উত্থান
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
হিটলার ও মুসোলিনীর উত্থান
ইতালিতে ফ্যাসিবাদের উত্থানের কারণ
বহুবিধ কারণে ইতালিতে ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটে। নিচে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-
১। ইতালির গণতন্ত্রের দুর্বলতা গণতন্ত্রের দুর্বলতা ইতালিতে ফ্যাসিবাদের উত্থানের অন্যতম কারণ। ক্যাভুরের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ ইতালিতে যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায় তাকে প্রকৃত গণতন্ত্র বলা যায় না। সম্পত্তির ভিত্তিতে ভোটদানের যোগ্যতা নির্ধারিত হওয়ায় ইতালিতে অনেক মানুষের ভোটাধিকার ছিল না। সাধারণ মানুষ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থেকে দূরে ছিল। সরকার গঠনে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ না থাকায় তারা গণতন্ত্র ও সরকার সম্পর্কে নিস্পৃহ থাকে, যার সুযোগ গ্রহণ করে ফ্যাসিস্টরা।
২। দক্ষিণ ইতালির অনগ্রসরতা দক্ষিণ ইতালির অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা এবং এ ব্যাপারে সরকারের নির্লিপ্ততা ইতালিতে ফ্যাসিবাদের উত্থানের আরেকটি কারণ। ইতালির একত্রীকরণের সময় থেকে উত্তর ইতালির তুলনায় দক্ষিণ ইতালি ছিল শিল্পে অনগ্রসর। তাছাড়া মাফিয়াদের উৎপাত ও ম্যালেরিয়ার প্রকোপ দক্ষিণ ইতালির জনগণের জীবনযাত্রাকে থমকে দিয়েছিল। কিন্তু একত্রীকরণের পর থেকে কোনো সরকারই উন্নয়নবৈষম্যের অবসান ও অন্যান্য সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসেনি; যার সুযোগ গ্রহণ করে মুসোলিনি দক্ষিণ ইতালিতে তার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করেন; যা মুসোলিনি বা ফ্যাসিস্টদের ক্ষমতালাভে সাহায্য করে।
৩। রাজনৈতিক মতানৈক্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পূর্ব থেকে ইতালির রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো ঐক্য ছিল না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগদানকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতানৈক্য আরও বৃদ্ধি পায়। সমাজতন্ত্রী ও ক্যাথলিক দল ইতালির প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগদানের তীব্র বিরোধী ছিল। কিন্তু বিরোধী দলগুলোর বিরোধিতাকে উপেক্ষা করে শাসক উদারতন্ত্রী দল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নানা ইস্যুতে মতবিরোধ দেখা দেয়; যা জনসাধারণকে ইতালির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে হতাশাগ্রস্ত করে তোলে; যার সুযোগ পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে ফ্যাসিস্টরা।
৪। পররাষ্ট্রনীতির দুর্বলতা ইতালি ছিল ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী একটি দেশ। অথচ ভূমধ্যসাগরের উপর ইতালির কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। ভূমধ্যসাগর নিয়ন্ত্রণ করত ফ্রান্স ও ব্রিটেন। ইতালির ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতি, শিল্পায়ন ও উপনিবেশ স্থাপনের জন্য প্রয়োজন ছিল ভূমধ্যসাগরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। একত্রীকরণ-পরবর্তী সরকারগুলোর ভূমধ্যসাগরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থতাকে কাজে লাগান মুসোলিনি। তিনি এজন্য সরকারের নতজানু পররাষ্ট্রনীতিকে দায়ী করেন এবং আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনগণের সমর্থন লাভ করেন, যা মুসোলিনি বা ফ্যাসিস্টদের ক্ষমতা লাভে সাহায্য করে।
৫। ভার্সাই সন্ধিতে ইতালির অপ্রাপ্তি: ভার্সাই সন্ধিতে ইতালির অপ্রাপ্তি মুসোলিনি বা ফ্যাসিস্টদের উত্থানের অন্যতম কারণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে ইতালি ছিল জার্মানির নেতৃত্বাধীন ত্রিপক্ষীয় চুক্তির সদস্য। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ইতালি প্রথমে নিরপেক্ষতা অবলম্বন করে। পরে মিত্রপক্ষের সাথে গোপন চুক্তির ভিত্তিতে মিত্রপক্ষের হয়ে যুদ্ধে অংশ নেয়, যাতে যুদ্ধ শেষে পুরস্কারস্বরূপ ইতালিকে কতগুলো এলাকা ছেড়ে দেওয়ার কথা ছিল। ফলে প্যারিস সম্মেলনে ইতালি ট্রিয়েস্ট, ডালমাশিয়া, ফিউম ও আফ্রিকার কিছু জার্মান উপনিবেশ দাবি করে। ইউরোপের বিভিন্ন শক্তি বিভিন্ন এলাকা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেয়। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের বিরোধিতায় ইতালিকে শূন্যহাতে সম্মেলন থেকে ফিরতে হয়, যা ইতালীয়দের মধ্যে ক্ষোভ, হতাশা ও অপমানবোধের জন্ম দেয়। ইতালীয়রা মনে করে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অর্থ ও রক্তের বিনিময়ে ইতালি কিছু পায়নি, যার জন্য তারা ক্ষমতাসীন সরকার, ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে দায়ী বলে মনে করে। এটি ইতালিতে উগ্র জাতীয়তাবাদের জাগরণ ঘটায়। উগ্র জাতীয়তাবাদীরা প্রচার করতে শুরু করে যে, বর্তমান উদারপন্থি সরকার ইতালিবাসীর আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে অক্ষম; যার সুযোগ গ্রহণ করে মুসোলিনি ইতালিতে ক্ষমতা দখল করেন।
৬। অর্থনৈতিক সংকট: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট ইতালিতে ফ্যাসিবাদের উত্থানের কারণ। এ সময় অর্থনৈতিক সংকট ভয়াবহ রূপ লাভ করে। জনগণের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, দ্রব্যমূল্য অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ও আয় না বাড়ায় জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। বহু কলকারখানা বন্ধ ও যুদ্ধফেরত সৈনিক ছাঁটাইয়ের ফলে বেকারত্ব তীব্রতর হয়। ফলে ধর্মঘট, অরাজকতা ও দেশব্যাপী অসন্তোষ বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ দুর্দশা মোকাবিলায় তৎকালীন উদারপন্থি সরকার চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়।
৭। সমাজতন্ত্রভীতি সমাজতন্ত্রভীতি ইতালিতে ফ্যাসিবাদের উত্থানের আরেকটি কারণ। অর্থনৈতিক সংকটের সুযোগে সমাজতান্ত্রিক দল প্রচার করতে শুরু করে যে, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠাই মুক্তির একমাত্র পথ। এ সময় ইতালিতে সমাজতন্ত্রীদের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। সমাজতান্ত্রিক পত্রিকা অভান্তি শ্রমিক ও কৃষকদের দারুণভাবে প্রভাবিত করে। ফলে কৃষকরা জমিদারদের জমি ও শ্রমিকরা মালিকদের কলকারখানা দখল করতে শুরু করে। এতে ইতালীয় বুর্জোয়াদের মধ্যে সমাজতন্ত্রভীতির সৃষ্টি হয়। তারা উদারতন্ত্রী সরকারের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলে।
৮। বুর্জোয়া শ্রেণির সমর্থন: বুর্জোয়া শ্রেণির সমর্থন মুসোলিনির ক্ষমতালাভে সাহায্য করে। মুসোলিনি ফ্যাসিস্ট বাহিনী গঠন করে ফ্যাসিস্ট স্বেচ্ছাসেবকদের দ্বারা সমাজতন্ত্রীদের বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও ধর্মঘট ভেঙে দিতে থাকেন। শৃঙ্খলাকে ফ্যাসিস্ট দলের মূলনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ফলে বুর্জোয়ারা মনে করতে থাকে, মুসোলিনির নেতৃত্বে গঠিত ফ্যাসিস্টরা ইতালিকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব থেকে রক্ষা করতে পারবে। তারা মুসোলিনির সমর্থনে এগিয়ে আসে। রাজা তৃতীয় ভিক্টর ইমানুয়েলও পরোক্ষভাবে ফ্যাসিস্ট দলের প্রতি আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। এ সকল কারণ ইতালিতে ফ্যাসিবাদ ও মুসোলিনির উত্থানের পটভূমি তৈরি করে।
সম্পর্কিত প্রশ্ন সমূহ

