- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- যৌবনের গান [গদ্য]
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
জাতিতে জাতিতে যুদ্ধ হয় ন্যায়-অন্যায় নিয়ে। অন্যায়ের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য যৌবন ক্ষিপ্ত সিংহের বিক্রমে রণক্ষেত্রে ছুটে যায়। প্রচণ্ড উল্লাস তার হূৎপিন্ডের রক্তে তরক্তিগত হতে থাকে। এই রক্তের উল্লাস, যৌবনের এই মরণ-ক্ষুধা মানুষের জীবনে এক পরম স্বর্গীয় দান। মানুষ কি চিরদিনই বেঁচে থাকে? কত যৌবন অকালে জীবনের সাধ-আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হতেই ব্যাধি, পীড়ায়, দুর্ঘটনায় কোথায় চলে যায়। এর চেয়ে মানব হিতে, সত্য প্রতিষ্ঠায়, ন্যায়-যুদ্ধে গৌরবে মৃত্যুবরণ করাই তো ভালো। যারা মৃত্যুকে ভয় করে তারাই হয়তো বেশি মরে।
জাতির কল্যাণে বজলুর রশিদ সর্বদা নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন। কথায় নয়, কাজে বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। কাজ করতেন অনাথের জন্য, অসহায়ের জন্য। নিজের বলতে তাঁর কিছুই ছিল না। মানুষের দুর্দশা লাঘবই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। মানুষকে তিনি শোনাতেন অভয়ের বাণী, তারুণ্যের গান।
রফিক সাহেবের বয়স এখন ষাটের উর্ধ্বে। তিনি প্রতিনিয়ত সমাজের কল্যাণমুখী কাজে ব্যস্ত থাকেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান, অসহায়ের পক্ষে কথা বলেন। তিনি কখনো নিজের স্বার্থের কথা ভাবেন না। সমাজের সবাই তাঁকে ভক্তি-শ্রদ্ধা করে। অপরদিকে একই এলাকার জামান সাহেবের বয়স মাত্র ত্রিশ বছর। তিনি সর্বদা অর্থের পিছনে ছোটেন। ন্যায়-অন্যায়, ভালোমন্দ বিবেচনা করেন না। নিজের স্বার্থের জন্য তিনি সর্বদাই ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। তাই সমাজের মানুষের কোনো কাজেই তিনি আসেন না।
অসীম সম্প্রতি এমএ পাশ করেছে। এখন সে চাকরির ইন্টারভিউ নিয়েই ব্যস্ত থাকে সারাক্ষণ। কিছুদিন আগে ঘূর্ণিঝড়ে দেশের একাংশের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলে অসীমের বন্ধুরা ত্রাণ সংগ্রহ করে উপদ্রুত এলাকায় যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়। তারা অসীমকেও এ কাজে আহ্বান করে, কিন্তু অসীম তা কৌশলে এড়িয়ে যায়। তার ধারণা, দেশে সরকার আছে, আরও অনেক মানুষ আছে, এসব তাদের কাজ। অসীম মনে মনে ভাবে, এসব কাজ করতে গেলে তার অনেক ক্ষতি হবে। অসীমের বন্ধুরা তাকে আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থপর মানুষ হিসেবে আখ্যা দেয়।
বৈশাখের এক ভয়াল ঘূর্ণিঝড়ে হিমেলের কলেজের পার্শ্ববর্তী মধুপুর এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের নানাভাবে সাহায্য করার জন্য তিন দিন কলেজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়। হিমেলের নেতৃত্বে ছাত্রদের একটি দল অসহায় মানুষদের সহায়তা। দেওয়ার জন্য দুর্গত এলাকায় পৌছায়। তারা নিরলসভাবে সেখানে কাজ করে চলে। অপরদিকে তিন দিনের ছুটি পেয়ে মজিদ, মোবাশ্বের, রতনসহ আরও অনেকে বাড়ি চলে যায়। আবার কেউ কেউ আড্ডা জমিয়ে ছুটির দিনগুলো কাটিয়ে দেয়।
কল্যাণপুর এলাকায় দিনকে দিন চাঁদাবাজদের অত্যাচার বেড়েই চলেছে। চাঁদা না পেলে তারা বাসার জিনিসপত্র লুট করে। এমনকি মারধর করে, মেরে ফেলার হুমকি দেয়। এলাকার কিছু প্রবীণ ব্যক্তি এই অত্যাচার মানতে চান না। তাঁরা এলাকাবাসীকে বোঝান, অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে। তাঁদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে কল্যাণপুরবাসী ঐক্যবন্ধভাবে চাঁদাবাজদের প্রতিহত করে।
চারদিকে যুদ্ধের ডামাডোল। কবীর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে আর বাড়ি ফেরেনি। বাড়িতে একদিন একটি চিঠি এলো। চিঠিতে লেখা ছিল, 'দেশের বঞ্চিত মানুষের জন্য মুক্তির লড়াই শুরু হয়েছে, এ লড়াইয়ের আরেক নাম মৃত্যুঞ্জয়ী লড়াই। সে লড়াইয়ে যোগ দিতে যাচ্ছি। আমি বিজয় আর মুক্তি নিয়েই ফিরে আসব।'
'দুরন্ত পথিক চলিয়াছিল, সেই মুক্ত দেশের উদবোধন বাঁশির সুর ধরিয়া।... এইবার তাহার পণের বিভীষিকা জুলুম আরম্ভ করিল। পথিক দেখিল, ওই পথ বাহিয়া যাওয়ার এক-আধটি অস্ফুট পদচিহ্ন এখনও যেন জাগিয়া রহিয়াছে। পথের বিভীষিকা তাহাদেরই মাথার খুলি এই নূতন পথিকের সামনে ফেলিয়া দিয়া বলিল, এই দেখ এদের পরিণাম। সেই খুলি মাথায় করিয়া নূতন পথিক আর্তনাদ করিয়া উঠিল, আজ, এরাই তো আমায় ডাক দিয়েছে। আমি এমনি পরিণাম চাই। আমার মৃত্যুতেই তো আমার শেষ নয়, আমার পশ্চাতে ওই যে তরুণ যাত্রীর দল, ওদের মাঝেই আমি বেঁচে থাকব। বিভীষিকা বলিল, 'তুমি কে?' পথিক হাসিয়া বলিল, 'আমি চিরন্তন মুস্তিকামী।'
যুবকেরা পাগল, বাবুদের মতো সহজেই তাদের মনে প্রতিবাদী চেতনার সৃষ্টি হয়। কারাগারে ফাঁসিতে কিছুতেই তাদের দর্পিত প্রাণ কাবু হয় না। এদের স্থিরতা, বীরত্ব, গাম্ভীর্য, ধর্মভয়, বিনয় জজ্ঞান বলতে কিছু নেই। ওরা সত্যিই পাগল, বাষ্পীয় ইঞ্জিনে আবন্দ শক্তি বলা যায়।
অবসরপ্রাপ্ত ফারুক সাহেবের কাঁচাপাকা চুল, মুখে বয়সের ছাপ। দেখলে মনে হয় তার যথেষ্ট বয়স হয়েছে। কিন্তু রাস্তার দুই ধারে গাছ লাগানো, রাস্তার গর্ত ভরাট করা প্রভৃতি জনকল্যাণমূলক কাজে নিরবচ্ছিন্ন পরামর্শ প্রদানে তার কোনো ক্লান্তি নেই। এছাড়াও পাড়ার ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাল্যবিবাহ রোধ, স্কুলগামী মেয়েদের স্কুলে পাঠানো, অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে পাঠানো- এ সমস্ত মানবিক কাজে তিনি সহযোগিতা করে থাকেন। মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।

