- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- শিল্প বিপ্লব
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
শিল্প বিপ্লব
ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা
শিল্পবিপ্লবের ফলে ইউরোপের চিরাচরিত কুটির শিল্প, প্রাচীন অর্থনীতি, সামন্ততন্ত্র প্রভাবিত সমাজে পূর্বতন রাজতন্ত্র ও অভিজাত সম্প্রদায়ের সুযোগ-সুবিধার অবসান ঘটে। আবার নগর-জীবন, মধ্যবিত্ত প্রভাবিত সমাজ, উদারনৈতিক ভাবধারা, শ্রমিক সমস্যা ও অন্যান্য সামাজিক সমস্যার উদ্ভব ঘটে। নতুন শিল্পপতি, কারখানার মালিক, বিত্তশালী বণিকগণ পূর্ববর্তী অভিজাত শ্রেণির প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন। কৃষিপ্রধান সমাজের বিলুপ্তি ঘটে এবং শিল্পভিত্তিক সমাজের উদ্ভব ঘটে। অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে ও উনবিংশ শতকের শুরুতে ইংল্যান্ডে যন্ত্রভিত্তিক শিল্পের বিকাশ ঘটলে শিল্পভিত্তিক পুঁজিবাদ বা ধনতন্ত্রের প্রসার দ্রুত হয়, যা এক শতকের মধ্যে ইউরোপের অন্যান্য দেশে প্রসার লাভ করে।
শিল্পবিপ্লবের ফলে ইউরোপে জনসংখ্যা ও নগর সভ্যতা প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে যেমন কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক প্রশাসনের পরিবর্তন ঘটে, তেমনি অর্থনৈতিক প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পবিপ্লবের ফলে অল্প সময়ের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে পণ্যসামগ্রী উৎপাদন হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে। ফলে পুঁজিপতিরা একচেটিয়া বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ও অধিক মুনাফা লাভের দিকে ঝুঁকে পড়ে। বস্তুত উনবিংশ শতকে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে উপনিবেশ বিস্তারের যে সংগ্রাম ও প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল, তার মূলে ছিল শিল্পবিপ্লবপ্রসূত পুঁজিপতিদের প্রভাব। পুঁজিপতি শ্রেণি নিজ নিজ দেশের সরকারকে শিল্পজাত পণ্যের বাজার সৃষ্টির জন্য ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য বিস্তারে উৎসাহ জোগায়। পুঁজিবাদের চরম পরিণতি হলো সাম্রাজ্যবাদ, যা উনবিংশ ও বিংশ শতকের শুরুতে প্রকট আকার ধারণ করে। অর্থাৎ পুঁজিবাদের বিকাশের সাথে ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য বিস্তার অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। অন্য জনগোষ্ঠীর ভূখণ্ড দখল করে যে পরদেশি শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয় তাকেই ঔপনিবেশিক শাসন বলে। প্রাচীন ও মধ্যযুগে বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠী অন্যের ভূখণ্ড দখলের মাধ্যমে শাসন করলেও শিল্পবিপ্লবের ফলে ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ও চরিত্র ছিল ভিন্ন।
উনবিংশ শতাব্দীতে শিল্পবিপ্লবজনিত পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে ইউরোপের বাইরে ইউরোপীয় দেশগুলোর সাম্রাজ্য বিস্তারের চেষ্টা নব উদ্যমে শুরু হয়। দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রকট আকার ধারণ করে। পুঁজিবাদের প্রসারের ফলে ইউরোপীয় দেশগুলোতে যৌথ বণিক সংঘের প্রতিষ্ঠা হয়, যাদের উপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না।' ফলে বণিক সংঘগুলোর মালিক ও অংশীদারগণ পুঁজি সঞ্চয় করে স্ফীত হয়ে ওঠে। এ প্রসঙ্গে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নাম উল্লেখ করা যায়। শুধু শিল্পবিপ্লবজনিত পরিবর্তিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতির জন্য ইউরোপীয় দেশগুলো উপনিবেশ বিস্তারের নীতি গ্রহণ করেনি। বরং এর পেছনে রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক উদ্দেশ্যও বিদ্যমান ছিল। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের ব্যাখ্যায় বলা যায়, সাম্রাজ্যের বিশালতার উপরই দেশের শক্তি, মর্যাদা ও গৌরবের মানদণ্ড নির্ভর করে। এ মনোবৃত্তিই ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে উপনিবেশ বিস্তারের প্রতিযোগিতা তীব্রতর করে। পাশ্চাত্য সভ্যতা ও খ্রিষ্টধর্ম প্রচারের মনোভাব তাদের উপনিবেশ স্থাপনে আগ্রহী করে তোলে। প্রত্যেক দেশের উদ্বৃত্ত জনসংখ্যার জীবিকার সন্ধানে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো সাম্রাজ্য বিস্তারের নীতি গ্রহণে উদ্বুদ্ধ হয়।
ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর উপনিবেশ বিস্তার
ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে উপনিবেশ স্থাপনের তেমন আগ্রহ দেখা যায়নি, বরং এ সময় স্পেন, পর্তুগাল ও ফ্রান্সের প্রাচীন ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য ক্রমশ ভেঙে পড়ছিল। একমাত্র ইংল্যান্ডই তার ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য বজায় রেখে উত্তরোত্তর আয়তন বৃদ্ধি করে যেতে থাকে। ১৭৮৩ থেকে ১৮১৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালকে ইংল্যান্ডের উপনিবেশ বিস্তারের একাধিপত্যের যুগ বলা যায়।
বিশ্বের দুটি অঞ্চল আফ্রিকা ও এশিয়ায় ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শোষণের নগ্নতা বিশেষভাবে প্রকটিত হয়। দাসত্ব থেকে মুক্ত নিগ্রো দাসদের পুনর্বাসনের জন্য প্রায় সমগ্র আফ্রিকা মহাদেশ ইউরোপীয় শক্তিগুলোর মধ্যে বণ্টিত হয়ে যায়। এশিয়া ভূখণ্ডে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদীদের প্রভাব প্রচণ্ডভাবে দেখা দেয়। উত্তরে রাশিয়া এক বিশাল ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য গড়ে তোলে, যার বিস্তৃতি ছিল উরাল পর্বতমালা থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত। দক্ষিণে ব্রিটেন ভারত ও বার্মায় সাম্রাজ্য বিস্তার করে এবং ফ্রান্স ইন্দোচীনের এক বৃহদংশ কুক্ষিগত করে। পারস্য ও মধ্য এশিয়া ইউরোপীয়দের প্রভাবাধীন অঞ্চলে পরিণত হয়।
পর্তুগিজ ও স্পেনীয় উপনিবেশ
আধুনিক যুগের কাছাকাছি সময়েও স্পেন ও পর্তুগাল নৌবিদ্যার পারদর্শিতাকে কাজে লাগিয়ে শোষণমূলক ও ভূবাসনমূলক উপনিবেশ প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করে। দেশ দুটি মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে উপনিবেশ স্থাপন করে। যদিও ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য বিস্তারের আধিপত্যে তারা তাদের ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে পারেনি।
ইংল্যান্ডের উপনিবেশ
আমেরিকার উপনিবেশগুলো ইংল্যান্ড হারালেও ইংল্যান্ডের ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। সপ্তদশ শতকে ওলন্দাজ আবিষ্কারকগণ সর্বপ্রথম অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের প্রতি সভ্য জগতের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও সেখানে উপনিবেশ স্থাপনে কোনো রাষ্ট্রই সফল হয়নি।
অষ্টাদশ শতকের শেষার্ধে ইংরেজ নাবিক ও আবিষ্কারক ক্যাপ্টেন কুক কর্তৃক অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড আবিষ্কৃত হয়। ১৭৮৭ খ্রিষ্টাব্দে ৯টি জাহাজে ইংরেজ অপরাধীদের সর্বপ্রথম এ নতুন আবিষ্কৃত অঞ্চলে পাঠানো হয়। ধীরে ধীরে অস্ট্রেলিয়া বাসস্থানের উপযোগী হয়। ৬টি উপনিবেশ সেখানে প্রতিষ্ঠিত হলে সমগ্র অস্ট্রেলিয়া ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হয়।
ওয়েকফিল্ডের নেতৃত্বে ১৮৪০ খ্রিষ্টাব্দে নিউজিল্যান্ডে ইংরেজ উপনিবেশ স্থাপিত হয়। কানাডার কুইবেক ছিল সর্ববৃহৎ এবং অধিবাসীরা ছিল ফরাসি। স্বভাবতই কুইবেকবাসীরা ছিল ব্রিটিশবিরোধী। ১৭৬২ খ্রিষ্টাব্দে কুইবেক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হয়। কানাডা ছিল সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত আমেরিকার সন্নিকটে। আমেরিকার প্রভাবাধীন হতে পারে- এ আশঙ্কায় ১৭৭৪ খ্রিষ্টাব্দে লর্ড নর্থ 'কুইবেক Act' পাস করে কুইবেকের জনসাধারণকে ধর্মীয় ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদান করেন। ১৮৬৭ খ্রিষ্টাব্দে কানাডা ডোমিনিয়নের মর্যাদা লাভ করে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের অধিকার পায়।
কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার ন্যায় ভারতবর্ষে ইংরেজ অপরাধীদের নির্বাসনজনিত সমস্যা বা শাসতান্ত্রিক সমস্যার উদ্ভব হয়নি। ২০০ বছর ধরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এখানে ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে যথেষ্ট রাজনৈতিক প্রতিপত্তি ও প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু বণিকদের হাতে ভারতের শাসনভার ছেড়ে দেওয়া যুক্তিসংগত নয় বিবেচনা করে ১৭৭৩ খ্রিষ্টাব্দে Regulating Act ও ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দে পিটের ইন্ডিয়া Act রচনা করে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট কোম্পানির রাজ্যে রাজনৈতিক বিষয় পরিচালনার দায়িত্ব পায়। ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তার কোম্পানির ভারতস্থ কর্মচারীদের দায়িত্ব ও প্রচেষ্টার ফলেই হয়েছিল।
পলাশী (১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে) ও বক্সারের (১৭৬৪ খ্রিষ্টাব্দে) যুদ্ধের ফলে ভারতে ইংরেজদের অধিকার ক্রমশ বিস্তার লাভ করতে থাকে। পরবর্তী একশ বছর ব্রিটিশ আধিপত্যের অগ্রগতি অব্যাহত থাকে। ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে সিপাহি বিদ্রোহের পর ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্তৃত্বের অবসান হয় এবং ভারতের শাসনভার ইংল্যান্ডের রানি ও পার্লামেন্টের হাতে অর্পিত হয়। ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে ইংল্যান্ড বার্মা অধিকার করে ভারত সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে।
উনবিংশ শতকের শেষার্ধে পশ্চিমে অরেঞ্জ রিভার থেকে পূর্বে নাটাল পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সিংহল, বার্মার উপকূলাঞ্চল, সিঙ্গাপুর, মালাক্কা প্রভৃতি স্থান দখল করে ইংল্যান্ড ভবিষ্যৎ ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য বিস্তারের পথ প্রশস্ত করে। ১৮৭৪ খ্রিষ্টাব্দে ইংল্যান্ড ফিজি দ্বীপপুঞ্জ দখল করে সেখানে উপনিবেশ স্থাপন করে।
হল্যান্ডের উপনিবেশ
১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে ওলন্দাজরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জাভা দ্বীপপুঞ্জ দখল করে উপনিবেশ স্থাপন করে। তাদের শাসনাধীনে জাভার জনসংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পায়। তারা প্রচুর মূলধন বিনিয়োগ করে জাভার অর্থনৈতিক জীবনে রূপান্তর ঘটায়।
আমেরিকার উপনিবেশ
ঔপনিবেশিক প্রতিযোগিতায় আমেরিকাও যোগ দেয়। প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপপুঞ্জের সাথে আমেরিকার স্বার্থ জড়িত ছিল। ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দে সামোয়া দ্বীপপুঞ্জ আমেরিকা দখল করে। এরপর ফিলিপাইন, গুয়াম ও ক্যারোলাইন দ্বীপপুঞ্জ আমেরিকার দখলে চলে যায়।
ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো দক্ষিণ আমেরিকায় উপনিবেশ বিস্তারে উদ্যোগী হয়। কিন্তু আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র 'মনরো নীতি' প্রয়োগ করে দক্ষিণ আমেরিকায় ইউরোপীয়দের উপনিবেশ স্থাপন নিষিদ্ধ করে দেয়। তথাপি দক্ষিণ আমেরিকার উন্নয়নের ক্ষেত্রে ব্রিটেনের অবদান ছিল সর্বাধিক।
ফ্রান্সের উপনিবেশ
অষ্টাদশ শতকে সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভারতে ফরাসি সাম্রাজ্য স্থাপনের আশা বিনষ্ট হয়। নেপোলিয়নীয় যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে আরও কিছু রাজ্য ফ্রান্সকে হারাতে হয়। ১৮৫২ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিম দ্বীপপুঞ্জের কতিপয় দ্বীপ, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভারতের কিছু অঞ্চল ছাড়া ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য বলতে অবশিষ্ট আর কিছুই ছিল না। কিন্তু তৃতীয় নেপোলিয়নের শাসনামলে ফরাসি সাম্রাজ্যবাদ নতুন উদ্যমে শুরু হয়। ১৮৩০ খ্রিষ্টাব্দে আফ্রিকার অন্তর্গত আলজিয়ার্স, অতঃপর আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল ও সেনেগাল, ফরাসি সাম্রাজ্যভুক্ত হয়। ১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দের পর আনাম, কম্বোজ, টলকিন ও নিউ ক্যালেডিনার দ্বীপপুঞ্জ ফরাসি অধিকারে আসে। সুতরাং উপনিবেশ স্থাপনে ফ্রান্সও অনগ্রসর ছিল না।
রুশ উপনিবেশ
এশিয়ার ভূখণ্ডে রাশিয়ার বিস্তৃতি ছিল সর্বাধিক, লক্ষ্য ছিল সমুদ্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ স্থাপন করা। ক্রিমিয়ার যুদ্ধের ফলে ইউরোপে রাশিয়ার সম্প্রসারণের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। ফলে রাশিয়া এশিয়ার দিকে নজর দেয়। উনবিংশ শতকের মধ্যভাগে রাশিয়া পারস্য, চীন ও মধ্য এশিয়ায় উপনিবেশ স্থাপনে প্রয়াস নেয়। দক্ষিণাভিমুখে অগ্রসর হয়ে রাশিয়া কাম্পিয়ান সাগরীয় অঞ্চল দখল করে ভারত সীমান্তে এসে পৌঁছে। রুশ সাম্রাজ্যের অগ্রগতি ব্রিটেনের ভারতীয় সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা বিপন্ন করে তোলে। ফলে ইঙ্গ-রুশ সম্পর্কে সংকট সৃষ্টি হয়।
কিন্তু পূর্বদিকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে রাশিয়ার সম্প্রসারণ অত্যন্ত সহজেই হয়। চীন সাম্রাজ্যের তাইপিং বিদ্রোহ এবং ব্রিটেন-ফ্রান্স যুদ্ধ বন্ধের শর্তানুসারে আমুর নদী পর্যন্ত চীনের একটি অংশ রাশিয়া লাভ করে। ১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দে রাশিয়া ভ্লাদিভস্টকে নৌবন্দর প্রতিষ্ঠা করে কোরিয়ার সন্নিকটে এসে উপস্থিত হয়। ফলে জাপান-রুশ সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং সুদূর প্রাচ্য সমস্যার সৃষ্টি হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে রাশিয়া ইউরোপের অন্যতম ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য হিসেবে আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভ করে।
ঔপনিবেশিক বিস্তারের ফলাফল
(ক) ইউরোপীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রসার দক্ষিণ আফ্রিকা, আমেরিকা, সাইবেরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপিত হলে সেখানে ইউরোপীয় সংস্কৃতি বিস্তার লাভ করে। এ অঞ্চলের অধিবাসীদের অধিকাংশই ছিল ইউরোপিয়ান এবং এদের মাতৃভাষা ছিল ইংরেজি। স্থানীয় অধিবাসীরা ইউরোপীয় ভাষা, সংস্কৃতি ও আচার-আচরণ গ্রহণ করে কালক্রমে ইউরোপীয় ভাবাপন্ন হয়ে ওঠে। তারা খ্রিষ্টধর্মও গ্রহণ করে।
কিন্তু এশিয়ায় ও উত্তর আফ্রিকায় ইউরোপীয় সভ্যতা জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়। কেননা এতদঞ্চল পাশ্চাত্য সভ্যতার সংস্পর্শে আসার পূর্বেই উন্নত মানের সভ্যতা ও সংস্কৃতির পীঠস্থান ছিল। এতদঞ্চলে ইউরোপীয় সভ্যতা প্রবর্তন করা হলেও তাদের প্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ থাকে। তবে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সংস্পর্শে আসার ফলে এসব অঞ্চলের সামাজিক আচার-আচরণ ও রাজনৈতিক আদর্শের বিবর্তন ঘটে।
(খ) অর্থনৈতিক শোষণ: ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর উপনিবেশ বিস্তারের মূলে ছিল শিল্পবিপ্লব। মাতৃভূমির অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতি দৃষ্টি রেখেই উপনিবেশগুলোকে শোষণ করা হয়েছিল। অবশ্য কোনো কোনো উপনিবেশে বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠা করে স্থানীয় জনগণের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথ উন্মুক্ত করা হয়েছিল।
(গ) ঔপনিবেশিক সংঘাত: ইউরোপের বাইরে ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য বিস্তারের ফলে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সংঘাত দেখা দেয়। মিশর ও সুদানকে নিয়ে ইঙ্গ-ফ্রান্স যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে। ইতালি-ফ্রান্স, ইঙ্গ-রুশ, রুশ-জাপান ও জার্মানি-ফ্রান্সের মধ্যে সম্পর্কে ফাটল ধরে। রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বিবাদ তীব্র হয়; যা ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য বিস্তারের এক নগ্নরূপ।
সম্পর্কিত প্রশ্ন সমূহ

