- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- ইংরেজ উপনিবেশিক শাসন : কোম্পানি আমল
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
ইংরেজ উপনিবেশিক শাসন : কোম্পানি আমল
লর্ড ডালহৌসি (১৮৪৮-১৮৫৬ খ্রি.) Lord Dalhousie (1848-1856 AD)
লর্ড হার্ডিঞ্জের পর লর্ড ডালহৌসি ৩৬ বছর বয়সে ভারতের গভর্নর নিযুক্ত হন। একজন সাম্রাজ্যবাদী, সংস্কারক ও উচ্চাভিলাষী শাসক হিসেবে তাঁর শাসনামল ভারতের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে। এক্ষেত্রে একমাত্র লর্ড ওয়েলেসলির সাথে তার তুলনা চলে। উপমহাদেশে তার নীতি ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ব্যাপক বিস্তৃত সাধন। ড. মজুমদার বলেছেন, "লর্ড ডালহৌসির শাসনকাল বহু ভারতীয় রাজ্যের উৎখাতের এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তারের জন্য উল্লেখযোগ্য। তার সাম্রাজ্যবাদ নীতিকে ৩টি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা: (১) প্রত্যক্ষ যুদ্ধের দ্বারা রাজ্য বিস্তার (২) স্বত্ব বিলোপ নীতির প্রয়োগ দ্বারা রাজ্য বিস্তার এবং (৩) কু-শাসনের অযুহাতে রাজ্য অধিকার। (১) প্রত্যক্ষ যুদ্ধের দ্বারা রাজ্য বিস্তার: লর্ড ডালহৌসি ১৮৪৯ খ্রিষ্টাব্দে দ্বিতীয় শিখ যুদ্ধ দ্বারা পাঞ্জাবের শিখরাজ্য এবং ১৮৫২ খ্রিষ্টাব্দে দ্বিতীয় ব্রহ্ম যুদ্ধ দ্বারা ব্রহ্মদেশের অন্তর্গত পেণ্ড রাজ্য অধিকার করেন।
দ্বিতীয় শিখ যুদ্ধ: এ যুদ্ধের কারণ হিসেবে বলা যায়- প্রথমত, ১৮৪৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম শিখ যুদ্ধের পরাজয়ের গ্লানি শিখরা ভুলতে পারেনি, দ্বিতীয়ত, পাঞ্জাবের শাসন পরিচালনার ব্যাপারে লর্ড হার্ডিঞ্জের প্রবর্তিত ব্যবস্থা শিখরা মেনে নিতে পারেনি। ফলে শিখরা বিদ্রোহী হন এবং আফগান জাতি সুযোগ বুঝে শিখদের সাথে হাত মেলান। এ কারণেই লর্ড ডালহৌসি দ্বিতীয় শিখ যুদ্ধের ঘোষণা দেন।
১৮৪৯ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজ সেনাপতি এডওয়ার্ডস এবং নেপিয়ার-এর নেতৃত্বে দুটি বিশাল বাহিনী পর পর ঝিলাম নদীর তীরে বিলিয়ানওয়ালা এবং চীনাব নদীর তীরে গুজরাট শহরের উপকূলে সংঘটিত যুদ্ধে শিখদের সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করেন। শেরসিংহ সহ অন্যান্য শিখ নেতৃবৃন্দ আত্মসমর্পণ করলে দ্বিতীয় শিখ যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। এর ফলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সীমা সমগ্র পাঞ্জাব হয়ে আফগানিস্তানের সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।
দ্বিতীয় ব্রহ্ম যুদ্ধ: ১৮১৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম ব্রহ্ম যুদ্ধের পর থেকেই বর্মিদের সাথে ইংরেজদের সম্পর্ক খারাপ হয়। বর্মির ব্রহ্ম রাজ ১৮৪০ খ্রিষ্টাব্দে আভা হতে ব্রিটিশ রেসিডেন্টকে বিতাড়িত এবং ১৮৫১ খ্রিষ্টাব্দে বর্মিদের হাতে কতিপয় ব্রিটিশ বণিক লাঞ্চিত হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ১৮৫২ খ্রিষ্টাব্দে দ্বিতীয় ইঙ্গ ব্রহ্ম যুদ্ধ শুরু হয়। অতি অল্প সময়ের মধ্যে রেঙ্গুন, পোম এবং পেগু ব্রিটিশদের অধীনে চলে আসে। ব্রহ্মরাজ ডালহৌসির সাথে সন্ধি স্থাপন করলে সমগ্র পেগু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হয়।
(২) স্বত্ববিলোপ নীতি: সাম্রাজ্যবাদী লর্ড ডালহৌসি ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারে যে কয়টি পন্থা অবলম্বন করেন তার মধ্যে স্বত্ববিলোপ নীতি (Doentrine of Lapse policy) সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য। স্বত্ববিলোপ নীতির মূল কথা ছিল, ব্রিটিশের আশ্রিত বা অনুগৃহীত কোনো দেশীয় রাজ্যের রাজা অপুত্রক অবস্থায় মারা গেলে এবং তার রাজবংশে কোনো উত্তরাধিকারী না থাকলে সে রাজ্য সরাসরি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হবে। কোনো দত্তক বা পালিত পুত্রের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে না। এখানে উল্লেখ্য যে, প্রাচীন হিন্দু রীতি অনুযায়ী পুত্রহীন রাজা বা রাজবংশের রাজ্য রক্ষা করার জন্য দত্তক পুত্র গ্রহণ কোম্পানি কর্তৃক স্বীকৃত হয়েছিল। কিন্তু লর্ড ডালহৌসি এ নীতির দ্বারা দেশীয় রাজ্যগুলোর দত্তক পুত্র গ্রহণের দাবি অস্বীকার করে তা সরাসরি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করার ঘোষণা দেন।
স্বত্ব বিলোপ নীতি গ্রহণ করে লর্ড ডালহৌসি ১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দে সাতারা, ১৮৫০ খ্রিষ্টাব্দে সম্ভলপুর, ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দে নাগপুর, ঝাঁসি এবং পরে ভগৎ, উদয়পুর, কর্নাটক, তাঞ্জোর এবং কারাউলী ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ভুক্ত করেন। (অবশ্য কারাউলী ইংরেজদের মিত্র রাজ্য বিধায় পরে এটিকে ফেরত দেওয়া হয়)। পেশোয়া দ্বিতীয় বাজীরাও এর মৃত্যুর পর তার দত্তক পুত্র নানা সাহেবের (ধুন্দ পন্থ) বৃত্তি বন্ধ করে দিয়ে এ রাজ্যগুলোও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করেন।
উক্ত নীতি প্রয়োগ করে রাজ্য গ্রাসকরণে দেশীয় রাজ্যগুলোর মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। যার ফলে ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে মহাবিদ্রোহে ঝাঁসির রানি ও অন্যান্য রাজন্যবর্গ ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। লর্ড ডালহৌসির স্বত্ব বিলোপ নীতিকে ঐতিহাসিক কেয়ি 'নিষ্ঠুর' হিসেবে অভিহিত করেছেন।
(৩) কু-শাসনের অজুহাতে রাজ্য দখল লর্ড ডালহৌসি রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও কু-শাসনের অজুহাতে ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দে অযোধ্যা রাজ্যটিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করেন। ড. এম.এন সেন বলেন "অযোধ্যার নবাব পরিবারের প্রতি বর্বরোচিত ব্যবহার ও নিষ্ঠুর আচরণ ব্রিটিশ জাতির মর্যাদায় কলঙ্ক লেপন করেছে। হায়দ্রাবাদের নিজামের নিকট থেকে 'বেরাব' প্রদেশটি কেড়ে নিয়ে তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করেন।"
লর্ড ডালহৌসির সংস্কারমূলক কার্যাবলি
লর্ড ডালহৌসি একজন সাম্রাজ্যবাদী শাসক হিসেবে চিহ্নিত হলেও রাজ্য শাসন ও সামাজিক সংস্কারে তার অবদান অনেকখানি। তার সম্পর্কে ইংরেজ ঐতিহাসিক স্যার রিচার্ড টেম্পল বলেন, "শাসক হিসেবে ইংল্যান্ডের কর্তৃপক্ষ যে সমস্ত বিখ্যাত ব্যক্তিকে এদেশ শাসন করতে প্রেরণ করেন তাদের মধ্যে কেহই ডালহৌসিকে অতিক্রম করতে পারেন নি।" ভারতে তাঁর আট বছর শাসনামলে উপমহাদেশের ইতিহাসকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে এক নতুন যুগের সৃষ্টি করে। পার্সিভ্যাল স্পিয়ার তাকে আধুনিক ভারতের প্রতিষ্ঠাতা বলে অভিহিত করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য সংস্কার হচ্ছে-
শাসন সংস্কার: ডালহৌসি শুধু একজন সাম্রাজাবাদী শাসক ছিলেন না। তিনি একজন শ্রেষ্ঠ শাসকও ছিলেন। শাসন অবস্থায় তিনি বেশ কিছু সংস্কার করেছিলেন। তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতার অন্যতম কৃতিত্ব হলো বাংলাদেশের জন্য একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নর বা ছোট লাট নিযুক্ত করা। এতে গভর্নর জেনারেলের কাজের চাপ কিছুটা হ্রাস পেয়েছিল। ডালহৌসি ভারতীয় উপমহাদেশে সুষ্ঠ শাসন প্রবর্তনের জন্য সমগ্র ভারতকে কতকগুলো জেলায় বিভক্ত করেন এবং জেলার বেসামরিক কর্মচারীদের বিভাগীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন।
সামাজিক সংস্কার: সমাজ সংস্কারে লর্ড ডালহৌসি প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করে। তাঁর আগমনের পূর্বে ভারতীয় হিন্দু সমাজে বিধবা বিবাহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অকৃত্রিম সাহায্য ও সহযোগিতায় লর্ড ডালহৌসি হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন পাস করেন। অপর এক আইন পাস করে তিনি ধর্মান্তরিত ভারতবাসীকে পৈত্রিক সম্পত্তি ভোগ করার অধিকার আইনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করেন।
প্রযুক্তির প্রবর্তন: লর্ড ডালহৌসিকে ভারতীয় রেলপথের জনক বলা হয়। ভারতে রেলপথ নির্মাণের জন্য তিনি বিখ্যাত রেলপথ স্মারকলিপি রচনা করেন এবং ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে উপমহাদেশে তিনি সর্বপ্রথম রেল লাইন চালু করেন। বৈদ্যুতিক টেলিগ্রাফের তার স্থাপন এবং ডাক বিভাগ প্রবর্তন করেন। ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা থেকে আগ্রা পর্যন্ত ভারতের প্রথম টেলিগ্রাফ লাইন স্থাপন করে আধুনিক প্রযুক্তির প্রবর্তন করা হয়। সর্বত্র রাস্তাঘাট নির্মাণ, পয়ঃপ্রণালি খনন প্রভৃতি জনহিতকর কাজের জন্য তিনি 'পূর্ত বিভাগ' (Public works department) স্থাপন করেন। এ সময় কলকাতা হতে পেশোয়ার পর্যন্ত 'গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড' নির্মিত হয়। ভারতে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নে ডালহৌসির অবদান অপরিসীম।
পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রবর্তন লর্ড ডালহৌসি তাঁর প্রগতিশীল চিন্তা-ভাবনা দ্বারা ভারতবর্ষে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি বোর্ড অফ কন্ট্রোলের প্রেসিডেন্ট স্যার উডের সাহায্যে শিক্ষা বিষয়ক এক পরিকল্পনা প্রস্তুত করেন। যা উডের ডেসপ্যাচ- ১৮৫৪ নামে পরিচিত। একে এ দেশের বর্তমান প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতির ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। উড সাহেবের নির্দেশনায় ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে শিক্ষা বিষয়ক নির্দেশপত্র প্রণীত হয়। এ নির্দেশপত্র কয়েকটি সুপারিশ করে। সুপারিশগুলো হলো-
১. লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে প্রেসিডেন্সি শহরগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে। এগুলো শুধুমাত্র পরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করবে এবং কোনো শিক্ষাদান কার্যক্রম গ্রহণ করবে না।
২. উচ্চ মাধ্যমিক এবং স্নাতক পর্যায়ের কলেজগুলোকে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে নিবন্ধিত হতে হবে।
৩. প্রতি প্রদেশে শিক্ষা বিভাগ থাকবে।
৪. শিক্ষক প্রশিক্ষকণের জন্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা হবে।
৫. শিক্ষা বিস্তার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। ব্যক্তি উদ্যোগে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বীকৃতি দিতে হবে যদি তা যথাযথ মানসম্মত হয়।
৬. বিভিন্ন প্রদেশের শিক্ষা কার্যক্রম সমন্বয় করার জন্য ভারতে একজন শিক্ষা মহাপরিচালক থাকবেন।
উডের ডেসপ্যাচ অনুযায়ী ডালহৌসি জন শিক্ষা দপ্তর সৃষ্টি করে বিভিন্ন অঞ্চলে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। বেসরকারি স্কুল কলেজসমূহে তিনি সরকারি অনুদান প্রদানের ব্যবস্থা করেন। এর মধ্যে কলকাতা, মাদ্রাজ ও মুম্বাইয়ে ১৮৫৭খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। একমাত্র নারী শিক্ষা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে কাউন্সিলের সদস্য বেথুন সাহেব কলকাতায় বেথুন মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। তার শাসনামলে ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি সর্বশেষ সনদপ্রাপ্ত হন। ১৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রাপ্ত সনদের মেয়াদ শেষ হলে উক্ত সনদ প্রদান করা হয়। এই সনদ বলে ভারতীয়রা সর্বপ্রথম উচ্চ পদে নিয়োগ লাভের অধিকার পায়। বাংলাদেশ শাসনে লেফটেন্যান্ট গভর্নর বা ছোটলাট পদ এ সনদে স্বীকৃত হয়।
লর্ড ডালহৌসির কৃতিত্ব বিচার
লর্ড ডালহৌসি ভারতের গভর্নর জেনারেলদের মধ্যে সম্ভবত সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন। জনৈক ঐতিহাসিক বলেছেন, "ডালহৌসির 'পূর্ববর্তী আমলে কেউ ছিলেন শাসক, কেউ ছিলেন বিজেতা, কেউ ছিলেন নির্মাতা, আবার কেউবা ছিলেন সংস্কারক, কিন্তু লর্ড ডালহৌসি একাই ছিলেন সর্ব কৃতিত্বের অধিকারী।" যুদ্ধ পরিচালনায় তিনি ছিলেন প্রাচ্যের একজন আব্রাহাম লিংকন, শান্তি স্থাপনে তিনি ছিলেন আরও বেশি বিখ্যাত।
সম্পর্কিত প্রশ্ন সমূহ

