• হোম
  • একাডেমি
  • সাধারণ
  • একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
  • ইংরেজ উপনিবেশিক শাসন : কোম্পানি আমল
ইংরেজ উপনিবেশিক শাসন : কোম্পানি আমল

পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।

Back

ইংরেজ উপনিবেশিক শাসন : কোম্পানি আমল

ইংরেজ বিরোধী আন্দোলন Movements Against the English

পলাশীর যুদ্ধে জয়ের ফলে উপমহাদেশে ইংরেজরা দু'শ বছরের মোগল সাম্রাজ্যের অবসান ঘটিয়ে ব্রিটিশ শাসনের সূত্রপাত করে। শুরু থেকেই ব্রিটিশদের সাম্রাজ্যবাদ নীতি এবং নির্যাতন ও নিপীড়নে এদেশীয় রাজা-প্রজা, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, সিপাহি ও জনতা সকলের মধ্যে ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব দানা বাঁধতে থাকে। পুঞ্জীভূত ক্ষোভের ফলে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে সৃষ্টি হয় খণ্ড খণ্ড বিদ্রোহ। প্রাথমিক পর্যায়ের এ সকল বিদ্রোহের মধ্যে অন্যতম ছিল-

১। ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ (১৭৬০-১৮০০ খ্রি.)।

২। কৃষক বিদ্রোহ (১৭৮৩ খ্রি.)।

৩। বালাকী শাহের বিদ্রোহ (১৭৯১-১৭৯২ খ্রি.)।

৪। হাজী শরিয়তউল্লাহর ফরায়েজী আন্দোলন (১৮১৮-১৮৬২ খ্রি.)।

৫। ওহাবী ও শহিদ তিতুমীরের আন্দোলন ১৮২২-১৮৩১ খ্রি.)।

৬। সাঁওতাল বিদ্রোহ। (১৮৫৪-১৮৫৬ খ্রি.)

৭। নীলকরদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ (১৮৬০ খ্রি.)।

৮। মহাবিদ্রোহ বা ভারতবর্ষের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ (১৮৫৭ খ্রি.)।

ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহ (১৭৬০-১৮০০ খ্রি.) [Revolt of Fakirs and Sannasies (1760-1800 AD)]

ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে প্রাথমিক বিদ্রোহগুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম হলো ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহ। ফকিরগণ ছিল সুফি সম্প্রদায়ভুক্ত সংসারত্যাগী। দিনাজপুর জেলার বলিয়াদী গ্রামে ফকিরদের আস্তানা ছিল। শাহজাদা সুজা যখন বাংলার সুবেদার ছিলেন তখন তিনি ফকির ধর্মগুরু শাহ সুলতান হাসানি মাদিয়া বরহানাকে কয়েকটি বিশেষ অধিকার উল্লেখ করে সনদ দান করেন। এর ফলে তাদের প্রভাব বেড়ে যায়। উরশ বা বাৎসরিক উৎসবে তারা পাণ্ডুয়া, দিনাজপুর ও মহাস্থানগড়ের দরগায় মিলিত হতো। প্রথমদিকে তারা ভিক্ষা করলেও পরে তারা জোরপূর্বক নজরানা আদায় করতে আরম্ভ করে।

অপরদিকে, সন্ন্যাসীগণ ছিল আধ্যাত্মিক সাধনায় নিয়োজিত হিন্দু সংসারত্যাগী কিন্তু তারা আধ্যাত্মিক সাধনা থেকে বিচ্যুত হয়ে জাগতিক সুখভোগে লিপ্ত হয়। বাৎসরিক স্নানোৎসবে তারা মহাস্থান, চিলমারি, সিংজানি (ময়মনসিংহ) লাঙ্গলবন্দ (নারায়ণগঞ্জ) মিলিত হতো।

অষ্টাদশ শতকের রাজনৈতিক অস্থিরতায় ফকির-সন্ন্যাসী সামরিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি করতে থাকলে তাদের সাথে দরিদ্র কৃষক, সম্পত্তিহারা জমিদার ও বেকার সৈন্যদল যোগ দেয়। ১৭৬৪ খ্রিষ্টাব্দে বক্সারের যুদ্ধে মীর কাশিমের পক্ষে প্রায় ৫০০০ ফকির-সন্ন্যাসী যোগ দিয়েছিল। ফকির-সন্ন্যাসীদের ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাবের অন্যতম কারণ ছিল- (১) ইংরেজ কর্তৃক ফকির-সন্ন্যাসীদের অবাধ চলাফেরায় বাধা দান। (২) ভিক্ষা ও মুষ্টি সংগ্রহ নিষিদ্ধ। (৩) ফকির সন্ন্যাসীদের দস্যু আখ্যায়িত করা। (৪) তাদের বিরুদ্ধে জমিদারদের লেলিয়ে দেওয়া প্রভৃতি। ফকির বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন মজনু শাহ মাস্তান, তার সহযোগী ছিল মুসা শাহ্, চেরাগ আলী, পরাগ শাহ, সোবহান শাহ, মাদার বকশ, করিম শাহ, নুরুল মোহম্মদ, জরিশাহ ও রওশন শাহ প্রমুখ। সন্ন্যাসী দলের নেতৃত্ব দেন ভবানী পাঠক, তার সহযোগী ছিল দেবী চৌধুরানী।

১৭৬০ খ্রিষ্টাব্দে সন্ন্যাসীগণ বর্ধমান জেলায় প্রথম ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সরাসরি সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়। ১৭৬৩ খ্রিষ্টাব্দে ফকিরগণ বরিশালে এবং ঢাকার ইংরেজ কোম্পানির কুঠি আক্রমণ করে দখল করে। অবশ্য পরে ইংরেজগণ তা পুনরুদ্ধার করে। ঐ বছর সন্ন্যাসীরা রাজশাহীর কোম্পানি ফেক্টরির অধিকর্তা বেনটেকে হত্যা করে। ফকির-সন্ন্যাসীদের কর্মকাণ্ডে আতঙ্কিত হয়ে ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৬৭ ও ১৭৬৯ খ্রিষ্টাব্দে মজনু শাহকে আক্রমণ করে। মজনু শাহ সে আক্রমণ প্রতিহত করে সেনাপতি হার্টল ও লে. কিথসহ অনেক ইংরেজ সৈন্য তার হাতে নিহত হয়। এ সাফল্যে ফকির-সন্ন্যাসীদের সাহস ও মনোবল আরও বেড়ে যায়। ১৭৭১ খ্রিষ্টাব্দে ফকির মজনু শাহ সমগ্র উত্তর বাংলায় এক বড় রকমের ব্রিটিশ বিরোধী তৎপরতা আরম্ভ করেন। ১৭৭২ খ্রিষ্টাব্দে মজনু শাহ ২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজশাহী আক্রমণ করেন। তার নেতৃত্বে ফকিরগণ বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর, পাবনা, ময়মনসিংহ ও ঢাকায় কর্মতৎপরতা চালায়। মধুপুর জঙ্গলে ফকিরদের একটি শক্তিশালী ঘাঁটি ছিল। জমিদারগণ তাদের আক্রমণে সর্বদা ভীত থাকত।

১৭৭২ খ্রিষ্টাব্দে সন্ন্যাসীরা রংপুরে সিপাহিদের যুদ্ধে পরাজিত করে ক্যাপ্টেন টক্সকে হত্যা করে। সন্ন্যাসীরা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে আক্রমণ চালাত। প্রতি দলে একজন নায়কের অধীনে প্রায় পাঁচ থেকে সাত হাজার নাগা সন্ন্যাসী থাকত। ১৭৭৩ খ্রিষ্টাব্দে ক্যাপ্টেন এডওয়ার্ডস ও সার্জেন্ট মেজর ডগলাস ৩০০ সৈন্য নিয়ে আক্রমণ করতে এসে নিহত হন।

বঙ্কিম চন্দ্রের 'দেবী চৌধুরানী' নামক উপন্যাসে সন্ন্যাসী বিদ্রোহের বর্ণনা পাওয়া যায়। এ উপন্যাসে ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানী বাংলায় সন্ন্যাসী বিদ্রোহের বিখ্যাত নায়ক ও নায়িকা। দেবী চৌধুরানী নৌকায় থাকতেন এবং বহু বেতনভোগী অনুচর রাখতেন। তার অনুচরগণ অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত থাকত। মজনু শাহের রনকৌশল ছিল অতর্কিত আক্রমণ এবং নিরাপদে পালায়ন। ইংরেজদের ক্রমাগত আক্রমণে তারা বাংলা বিহার ত্যাগ করে মহারাষ্ট্রের দিকে চলে যেতে বাধ্য হয় এবং এক পর্যায় তাদের বিদ্রোহ থেমে যায়।

ব্যর্থতার কারণ: ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের আধিপত্য বিস্তারের বিরুদ্ধে ফকির-সন্ন্যাসী প্রথম বিদ্রোহ ঘোষণা করে। নানান কারণে ফকির সন্ন্যাসীদের বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়। নিম্নে এ বিদ্রোহ ব্যর্থতার প্রধান প্রধান কারণগুলো তুলে ধরা হলো-

(ক) দলীয় কোন্দল: ফকির নেতা মজনু শাহ ১৭৮৭ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করলে ফকিরদের মধ্যে দলীয় কোন্দল সৃষ্টি হয়।

(খ) ইংরেজদের শক্তি বৃদ্ধি: ফকির সন্ন্যাসীদের বিরুদ্ধে ইংরেজরা শক্তি বৃদ্ধি করলে ফকিরগণ ইংরেজদের কাছে বিভিন্ন স্থানে পরাজিত হতে থাকে। ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দে তারা চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়।

(গ) বাঙালি জনসাধারণের অসহযোগিতা: মজনু শাহ ও ভবানী পাঠক বাঙালি ছিল না, সুতরাং তারা বাঙালিদের খুব একটা সহযোগিতা পায়নি। তাছাড়া তারা বন-জঙ্গলে আস্তানা গড়ত ফলে সাধারণ মানুষের সাথে তাদের কোনো যোগাযোগ ছিল না।

(ঘ) ফকির ও সন্ন্যাসীদের পরস্পর কলহ ফকির ও সন্ন্যাসীরা পৃথক পৃথকভাবে তাদের অভিযান চালাত এবং প্রায়ই তারা পারস্পরিক সংঘর্ষে লিপ্ত হতো।

(ঙ) জাতীয়তা বোধের অভাব: ফকির ও সন্ন্যাসীরা নিজ নিজ স্বার্থ রক্ষায় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। দেশ রক্ষা বা জাতীয়তাবোধ তাদের লক্ষ্য ছিল না। যার ফলে ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দে উক্ত বিদ্রোহ সম্পূর্ণরূপে থেমে যায়।

কৃষক বিদ্রোহ (১৭৮৩ খ্রি.) [Peasants Revolt (1783 AD)]

বাংলার কৃষকরা যুগের পর যুগ অবহেলিত, অত্যাচারিত। তাই বলে তারা সবসময় অত্যাচার ও অবিচার নীরবে সহ্য করেনি। ১৭৮৩ খ্রিষ্টাব্দে রংপুরের কৃষক বিদ্রোহ তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই বিদ্রোহের কারণ ছিল কোম্পানি সরকারের রাজস্ব নীতি। ওয়ারেন হেস্টিংস তার অনুচর দেবী সিংহকে রংপুর ও পূর্ণিয়া জেলার রাজস্ব ঠিকাদারী দিয়েছিলেন। দেবী সিংহ এবং তার সহকারী হরেরামের কর আদায় অত্যাচার চরমে উঠলে দিনাজপুর ও রংপুরের হিন্দু ও মুসলমান কৃষক সংঘবদ্ধ হয়ে ১৭৮৩ খ্রিষ্টাব্দে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। যা ইতিহাসে কৃষক বিদ্রোহ নামে পরিচিত। এই বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন নুরুদ্দীন। বিদ্রোহী কৃষকরা তাকে নবাব উপাধিতে ভূষিত করে। ১৭৮৩ খ্রিষ্টাব্দে ২২ ফেব্রুয়ারি পাটগ্রামে বিদ্রোহী কৃষকদের সঙ্গে লে. ম্যাকডোনাল্ডের নেতৃত্বাধীন ব্রিটিশ সৈন্যের এক ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। ইংরেজদের কামানের আঘাতে বিদ্রোহী ছত্রভঙ্গ হয় এবং অনেকেই হতাহত হয়।

বিদ্রোহের কারণ অনুসন্ধানে দেবী সিংহের অতিরিক্ত কর আদায়ের লোমহর্ষকর চিত্র ফুটে উঠলে তাকে অপসারণ করা হয়। হেস্টিংসকে আইনের মুখামুখি করা হয়। ব্রিটিশ সরকার রংপুর জেলায় রাজস্ব আদায়ে নতুন ব্যবস্থা গ্রহণ করেন, কৃষক বিদ্রোহের ৫ জন নেতাকে নির্বাসন দণ্ড দেওয়া হয়।

১৭৮৩ খ্রিষ্টাব্দে কৃষক বিদ্রোহ বাংলার ইতিহাসে একটি স্মরণীয় ঘটনা। এই বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও এর আদর্শই পরবর্তীকালে বাঙালিদের প্রতি ইংরেজদের নানা অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে প্রেরণা যুগিয়েছে।

বালাকী শাহের বিদ্রোহ (১৭৯১-১৭৯২ খ্রি.) [Revolt of Balaki Shae (1791-1792 AD)]

বালাকী শাহের নেতৃত্বে ১৭৯১-৯২ খ্রিষ্টাব্দে বাখেরগঞ্জ জেলার কৃষকগণ ইংরেজ শাসক ও জমিদারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। যা ইতিহাসে 'বালাকী শাহের বিদ্রোহ' নামে পরিচিত। বালাকী শাহ ছিলেন সুফি সম্প্রদায় ভুক্ত একজন ফকির নেতা। বালাকী শাহের বিদ্রোহের সাথে ফকির বিদ্রোহের পার্থক্য ছিল এই যে, ফকির বিদ্রোহ ছিল নিজস্ব স্বার্থ উদ্ধারে অনেকটা ইংরেজ সরকারের হস্তক্ষেপের প্রতিবাদ। আর বালাকী শাহের বিদ্রোহ ছিল ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রাম। ১৭৯১ খ্রিষ্টাব্দে ডিসেম্বর মাসে ৫০০০ সশস্ত্র শিষ্য নিয়ে বালাকী শাহ বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তিনি চন্দ্রদ্বীপ (বর্তমান বরিশাল) ও সলিমাবাদের অনেক অত্যাচারী তালুকদার, জমিদার ও ইজারাদারদের বন্দী করেন। সুবন্দিয়ার গ্রামে তিনি শাহবন্দর নামে একটি মাটির দুর্গ নির্মাণ করেন। ১৭৯১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ১৭৯২ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজদের সাথে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বালাকী শাহ পরাজিত ও বন্দী হন। তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলন করে তিনি ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।।

পাইক বিদ্রোহ (১৮১৭ খ্রি.) [Revolt of Paik (1817 AD)]

১৮১৭ সালে পাইকরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ইতিহাসে এ বিদ্রোহ পাইক বিদ্রোহ নামে পরিচিত। পাইকরা বিদ্রোহী হয়ে বাহারামপুরের পুলিশ ঘাঁটি ও সরকারি কার্যালয়গুলোর উপর আক্রমণ চালায়, শহরের যাবতীয় বাড়িঘরগুলো জ্বালিয়ে দেয় এবং সরকারি খাজাঞ্চিখানা লুট করে। পাইক বিদ্রোহীরা প্রায় একশত ইংরেজকে হত্যা করে। এ অবস্থায় উড়িষ্যায় কিছুদিনের জন্য ইংরেজ শাসন নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

সম্পর্কিত প্রশ্ন সমূহ