• হোম
  • একাডেমি
  • সাধারণ
  • একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
  • ইংরেজ উপনিবেশিক শাসন : কোম্পানি আমল
ইংরেজ উপনিবেশিক শাসন : কোম্পানি আমল

পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।

Back

ইংরেজ উপনিবেশিক শাসন : কোম্পানি আমল

হাজী শরীয়তউল্লাহ ও ফরায়েজি আন্দোলন-১৮১৮-১৮৬২ Hazi Shariatullah and Faraizi Movement-1818-1862

পলাশীর প্রান্তে বাংলার স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হলে জাতির জীবনে এক মহাদুর্যোগ নেমে আসে। বিশেষ করে মুসলমান সমাজ জীবনে কুসংস্কার ও ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপ অনুপ্রবেশ করে তাদের নৈতিক শক্তিকে দুর্বল করে ফেলে। এ সময় মুসলমানদের নৈতিক শক্তি পুনরুদ্ধার করবার জন্য বেশ কয়েকজন প্রগতিশীল চিন্তাবিদদের আবির্ভাব ঘটে। তাদের মধ্যে হাজী শরীয়তউল্লাহ্ অন্যতম। অধঃপতিত মুসলিম সমাজ সংস্কারের লক্ষ্যে তিনি আন্দোলনে নেমে পড়েন। তার এই সংস্কার পন্থী আন্দোলন ইতিহাসে 'ফরায়েজি আন্দোলন' নামে খ্যাত। 'ফরায়েজি' শব্দটি এসেছে ফরজ বা অবশ্যকরণীয় শব্দ থেকে। ইসলামের বিধি-বিধান হুকুম আহকাম পালন দ্বারা শেরক ও বিদাত থেকে দূরে থেকে মুসলমানদের জীবনে নব জাগরণ সৃষ্টিই ছিল এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য।

হাজী শরীয়তউল্লাহ

হাজী শরীয়তউল্লাহ ১৭৮১ খ্রিষ্টাব্দে মাদারীপুর মহকুমার শামাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন (বর্তমান মাদারীপুর জেলা)। তার বয়স যখন আট বছর তখন পিতা আবদুল জলীল তালুকদার মৃত্যুবরণ করেন। অতঃপর চাচা আমিন উদ্দিনের তত্ত্বাবধানে পালিত হন। তিনি কলকাতা ও হুগলী জেলার ফুরফুরাতে শিক্ষালাভ করেন। ১৮ বছর বয়সে হজ পালন করতে গিয়ে বিশ বছর আরবদেশে অবস্থান করেন। সেখানে আলেমদের নিকট বিভিন্ন শাস্ত্র অধ্যয়ন করে ইসলামি জ্ঞান লাভ করেন। ১৮১৮, খ্রিষ্টাব্দে দেশে ফিরে এসে মুসলমানদের মধ্যে ইসলামের আদর্শ স্থাপনের উদ্দেশ্যে ফরায়েজি আন্দোলন শুরু করেন।

ঐ সময় বাংলার মুসলমানদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। তারা হিন্দু প্রভাবিত হয়ে কবর পূজা, পীর পূজা, মনসা পূজা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিব পূজায় লিপ্ত হয়েছিল।

তাছাড়া বৈষম্য ও শোষণমূলক ব্রিটিশ নীতির ফলে বাংলার মুসলমান সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পরে। এখানে উল্লেখ্য যে, হাজী শরীয়তউল্লাহ রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক নয় বরং ধর্মীয় কুসংস্কার ও কুপ্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন।

ধর্মান্তকরণের পূর্বে এদেশের অধিকাংশ মুসলমানই ছিলেন হিন্দু, বৌদ্ধ বা প্রকৃতি উপাসক। মুসলিম শাসনের রাজনৈতিক প্রভাব, পীর ফকিরদের আধ্যাত্মিক শক্তির প্রভাব ইত্যাদি কারণে স্থানীয় অধিবাসীগণ মামলাসন সর্শে নীলিদান সন। বিয়ে মুসলমান হলেও তাদের মধ্যে অসংখ্য পূব ধর্মজাত অমুসলিম আচার-অনুষ্ঠান বিদ্যমান ছিল।

ফরায়েজি আন্দোলন: ফরায়েজি আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল দুটি- ১। ধর্মীয় ব্যাপারে মুসলমানদের সচেতন করা এবং ২। ব্রিটিশদের এদেশ থেকে বিতাড়িত করা। এ লক্ষ্যে হাজী শরীয়তউল্লাহ বাংলার পল্লিতে পল্লিতে ঘুরে অধঃপতিত মুসলমানদের মধ্যে ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শ প্রচার করতে থাকেন। তিনি মুসলমান কর্তৃক অনৈসলামিক কার্যাবলিকে মহাপাপ ঘোষণা করেন। ঐ পাপকে তিনি দু' ভাগে বিভক্ত করেন- ১। কবর পূজা, পীর পূজা, সেজদা দেওয়া প্রভৃতিকে শেরক এবং ২। গাজী কালুর প্রশস্তি গাওয়া, পঞ্চপীরের, পীর বদল, খাজা-খিজিরের দোহাই দেওয়া, ভেরা ভাসানো, জারিগান গাওয়া, মহরম শোক প্রভৃতিকে বে'দাত বলে ঘোষণা করেন। তিনি 'পীর' ও 'মুরিদের' পরিবর্তে 'ওস্তাদ' ও 'সাগরেদ' ব্যবহার করতেন। তিনি তাজিয়া নির্মাণ মুহররম, পালন, মারসিয়া প্রভৃতির ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি বিবাহ উৎসবকে অনাড়ম্বরভাবে পালনের পরামর্শ দেন। বিবাহে হিন্দু আচার-রীতি যেমন- উলু দেওয়া, গায়ে হলুদ, আলপনা, নারকেল ভাঙা ইত্যাদিকে বর্জন করতে নির্দেশ দেন। তিনি শিশুর জন্ম উপলক্ষে উৎসব পালন, নামকরণ (আকিকা) এবং চল্লিশা (শিশু জন্মের ৪০ দিন পরে যে নাভীর সুতা ফেলতে হয়) এসব অনুষ্ঠানের ঘোর বিরোধী ছিলেন।

হাজী শরীয়তউল্লাহ ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষকে 'দারুল হবর' বা 'বিধর্মীর রাজ্য' বলে ঘোষণা করেন। তিনি ফতোয়া দেন যে, এ দেশে জুমুয়া ও ঈদের নামাজ বিধিসম্মত নয়। তিনি অত্যাচারী জমিদার ও নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। এজন্য হিন্দু জমিদারদের সঙ্গে তার সংঘাত বাধে। বাংলার কৃষকগণ দলে দলে তার সাথে যোগদান করতে থাকে। ঢাকা, বরিশাল, পাবনা, ময়মনসিংহে প্রভৃতি জেলায় তার সাংগঠনিক তৎপরতা ছিল। জেমস ওয়াইজ বলেন "হিন্দু জমিদারগণ ফরায়েজি আন্দোলনের বিস্তৃতিতে ভয় পেয়ে গেলেন। কারণ এ সংস্কার আন্দোলন মুসলমানদেরকে একতাবদ্ধ করেছিল। ১৮৪০ সালে যোগ্য পুত্র দুদু মিয়ার হাতে নেতৃত্ব ছেড়ে দিয়ে তিনি না ফেরার দেশে চলে গেলেন।

দুদু মিয়া

১৮৪০ খ্রিষ্টাব্দে হাজী শরীয়তউল্লাহর মৃত্যুর পর তার সুযোগ্য পুত্র মহসীনদ্দীন আহমদ ওরফে দুদু মিয়া ফরায়েজি আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ১৮১৯ খ্রিষ্টাব্দে দুদু মিয়া মাদারীপুর মহকুমা (বর্তমান মাদারীপুর জেলা) জন্মগ্রহণ করেন। তিনিও পিতার ন্যায় হজব্রত পালনের জন্য মক্কায় গমন করেন এবং দেশে ফিরে এসে পিতার স্থানে ইসলামের শুদ্ধি আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। তার প্রচেষ্টায় এই আন্দোলন একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়। যে কারণে কতিপয় ঐতিহাসিক তাকে ফরায়েজি আন্দোলনের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলে বর্ণনা করেছেন।

যোগ্য সংগঠক দুদু মিয়া ফরায়েজি আন্দোলনকে গতি সঞ্চয়ের জন্য পূর্ব বাংলাকে কয়েকটি অঞ্চলে বা হুলকায় বিভক্ত করে প্রত্যেক অঞ্চলে একজন প্রতিনিধি বা খলিফা নিযুক্ত করেন। ফরায়েজিদের ওপর কোনো হুলকায় আক্রমণ বা অত্যাচার হলে অন্য সকল কেন্দ্র থেকে তাদের সাহায্য করা হতো। তিনি মুসলমান প্রজাদের উপর আরোপিত বিভিন্ন বেআইনী কর (দুর্গা পূজা করা, কালিপূজা করা) প্রদানে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। তিনি প্রচার করেন যে, "জমি আল্লাহর দান, সুতরাং জমিদারদের কর ধার্য করার অধিকার নাই" দুদু মিয়া তার সাংগঠনিক কর্ম তৎপরতা দ্বারা অতি অল্প সময়ের মধ্যে মুসলিম সমাজে বিশেষ প্রভাব ও প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। বিবাদ মিটানোর জন্য প্রধান ফরায়েজিদের নিয়ে আদালত প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি জমিদার ও নীলকরদের অত্যাচার প্রতিহত করার জন্য জামালউদ্দিন মোল্লা নামে একজন নির্ভীক লাঠিয়ালের সাহায্যে এক শক্তিশালী লাঠিয়াল বাহিনী গঠন করেন।

ফরায়েজিদের উত্থান জমিদার ও নীলকররা সুনজরে দেখেনি। অত্যাচারী জমিদারদের প্রতিহত করার লক্ষ্যে ১৮৪১ সালে কানাইপুরের জমিদারদের বিরুদ্ধে এবং ১৮৪২ সালে ফরিদপুরের জমিদারদের বিরুদ্ধে অভিযান করে শক্তিশালী জমিদার মদন ঘোষকে হত্যা করে সাফল্য অর্জন করেন। ঐ বছর মদন ঘোষকে হত্যার অভিযোগে ব্রিটিশ সরকার ১১৭ জন 'ফরায়েজিকে বন্দী করে, এদের মধ্যে ২২ জনের ৭ বছর করে কারাদণ্ড হয়। কিন্তু দুদুমিয়ার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ না পাওয়ায় তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। তার জনপ্রিয়তা এত বৃদ্ধি পায় যে, তাকে "ত্রাণকর্তা" হিসেবে স্বাগত জানায়।

ঐতিহাসিক জেমস ওয়াইজ বলেছেন, ফরিদপুর, পাবনা, বাখেরগঞ্জ, ঢাকা ও নোয়াখালী জেলার প্রতি গৃহে তার নাম উচ্চারিত হতো। দুদু মিয়ার জনপ্রিয়তায় সংকিত হয় জমিদাররা ব্রিটিশদের সহযোগিতায় বিভিন্ন মিথ্যা মামলায় হয়রানি। শুরু করে। ১৮৫৭ সালে তথাকথিত সিপাহী বিদ্রোহ শুরু হলে রাজনৈতিক কারণে দুদু মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দে মুক্তির পর আবার গ্রেপ্তার করা হয়। ১৮৬০ সালে মুক্তি লাভ করেন, ১৮৬২ সালে ঢাকার ১৩৭ নং বংশাল রোডে ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুর সাথে সাথে ফরায়েজি আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পয়ে। অবশ্য তার ২ পুত্র গিয়াস উদ্দিন হায়দার (১৮৬২-৬৪), আ. গফুর (১৮৬৪-১৮৮৪) ফরায়েজি আন্দোলনের দুর্বল নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সময়ের ব্যবধানে ফরায়েজি আন্দোলন থেমে গেলেও উনবিংশ শতাব্দীর এটি ছিল একটি সর্বাত্মক ও সফলকামী ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন।

সম্পর্কিত প্রশ্ন সমূহ