• হোম
  • একাডেমি
  • সাধারণ
  • একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
  • ইংরেজ উপনিবেশিক শাসন : কোম্পানি আমল
ইংরেজ উপনিবেশিক শাসন : কোম্পানি আমল

পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।

Back

ইংরেজ উপনিবেশিক শাসন : কোম্পানি আমল

১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দের স্বাধীনতা সংগ্রাম Liberation War-1857 AD

পটভূমি (Background)

লর্ড ক্যানিং-এর শাসনামলে (১৮৫৬-১৮৬২ খ্রি.) ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসে ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে সংঘটিত মহাবিদ্রোহ একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এ বিদ্রোহ এত ব্যাপক ও বিস্তৃত ছিল যে একে প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বলা হয়। এই মহাবিদ্রোহের আঘাতে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য প্রায় ভেস্তে যেতে ছিল। নানা কারণে এ বিদ্রোহ ব্যর্থ হলে ব্রিটিশদের মনে এ বিদ্রোহ ভয়ের উদ্রেক সৃষ্টি করে। এ বিদ্রোহের পরেই ব্রিটিশদের টনক নড়ে। তারা অতি দ্রুত ভারতীয় শাসন ভার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিকট থেকে মহারানি ভিক্টোরিয়ার এক ঘোষণার মধ্য দিয়ে সরাসরি ব্রিটিশ সরকার গ্রহণ করে (১৮৫৮ খ্রি.)। ফলে একশত বছরের কোম্পানি শাসনের অবসান ঘটে। ব্রিটিশ ঐতিহাসিকরা এ সংগ্রামকে 'সিপাহি বিদ্রোহ' নামে অভিহিত করলেও ভারতীয় ঐতিহাসিকদের মতে এটি ভারতবর্ষের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম। কেননা ব্যারাকপুরের সিপাহি অসন্তোষের মধ্য দিয়ে এ সংগ্রামের সূত্রপাত হলেও তা অতি দ্রুত ভারতবর্ষের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। জনসাধারণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ সংগ্রামে অংশগ্রহণ করে। এ সংগ্রামের নামকরণে বিতর্কে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বলা হয় সিপাহিদের সাথে জনসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের গুরুত্ব অনুধাবন করে একে 'সিপাহি বিদ্রোহ' বা 'প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ' না বলে বরং ভারতীয় উপমহাদেশের 'মহাবিদ্রোহ' বলাই অধিক যুক্তিযুক্ত। এই মহাবিদ্রোহের পথ ধরেই উপমহাদেশের জনগণ ভবিষ্যৎ স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য তৈরি হয়।

মহাবিদ্রোহের কারণ

কোনো বিপ্লব বা সংগ্রাম যেমন একদিনে একটিমাত্র কারণে সংঘটিত হয় না। তেমনি ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের পশ্চাতেও অনেক দিনের অনেক কারণ বিদ্যমান ছিল। নিম্নে ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দের মহাবিদ্রোহের প্রধান কারণসমূহ আলোচনা করা হলো-

রাজনৈতিক কারণ: ব্রিটিশ আধিপত্য বিস্তারের সূচনালগ্ন থেকেই ভারতীয়রা ব্রিটিশ বিরোধী ছিল। বিশেষ করে ব্রিটিশদের সাম্রাজ্য বিস্তার নীতি ভারতীয় রাষ্ট্রগুলো মেনে নিতে পারছিল না। ওয়েলেসলির অধীনতামূলক মিত্রতানীতি দ্বারা হায়দ্রাবাদ রাজ্য গ্রাস করেন। লর্ড ডালহৌসি স্বত্ববিলোপ নীতি গ্রহণ করে সাতারা, নাগপুর, ঝাসি প্রভৃতি রাজ্য দখল করে। নানা সাহেবের ভাতা বন্ধ করে, কুশাসনের অভিযোগে ১৮৫৬ খ্রিষ্টাব্দে অযোধ্যা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করে। সম্রাট বাহাদুর শাহকে দিল্লির রাজপ্রসাদ থেকে বিতাড়িত করে। এ রকম প্রভৃতি আচরণে রাজন্যবর্গ, সিপাহি এবং জনসাধারণকে উত্তেজিত করে তোলে।

এছাড়া লর্ড কর্ণওয়ালিশ অষ্টাদশ শতকে যে শাসন সংস্কার করেছিলেন তার ফলে অনেক ভারতীয় উচ্চ পদ থেকে বঞ্চিত হন এবং সংখ্যাও হ্রাস করা হয়। ফলে ভারতীয়দের মনে ব্রিটিশদের প্রতি বিদ্বেষ ও বিতৃষ্ণা বহুগুণ বেড়ে যায়, যা পুঞ্জিভূত হয়ে মহা বিদ্রোহের রূপ নেয়।

অর্থনৈতিক কারণ: ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের অন্যতম কারণ ছিল ব্রিটিশ সরকারের লাগামহীন অর্থনৈতিক শোষণ। ১৭৫৭ সালের পলাশীর লুণ্ঠনের মধ্য দিয়ে সম্পদের যে অপহরণ শুরু হয়েছে তার ফলে সমৃদ্ধশালী ভারতবর্ষে দারিদ্র্য নেমে আসে। বিভিন্ন উপায়, বিভিন্ন অযুহাতে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির লোকজন যে অর্থ আত্মত্মসাৎ ও পাচার করছে তাতে ভারতবর্ষ ভিক্ষার ঝুলিতে পরিণত হয়। যা থেকে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। কোম্পানির ভূমি রাজস্ব নীতির ফলে এদেশের একদা সমৃদ্ধ কৃষককুল, বণিক ও মহাজনদের কাছে ঋণগ্রস্ত হয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে এবং ভূমিহীন কৃষকে পরিণত হয়। সমসাময়িক দার্শনিক কার্ল মার্কস ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের কারণ সম্পর্কে বলেছেন-

১। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে ভারতীয় কৃষকদের উপর জমিদার ও রাজস্ব আদায়কারী শক্তির যুগ্ম শোষণ।

২। কৃষকদের উপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপানো।

৩। সেচ ব্যবস্থা ও স্থানীয় শিল্প ধ্বংস।

৪। ব্রিটিশ পণ্যের ভারতীয় বাজার দখল ও কৃষকদের উপর বিবিধ অত্যাচারমূলক আইন কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে এবং পরিত্রাণের আশায় মহাবিদ্রোহের সামিল হয়।

সামাজিক কারণ: ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেছেন "ভারতের সকল শ্রেণির মানুষ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ভীষণভাবে অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন"। ইংরেজরা ভারতবাসীকে নীচুজাত ও বর্বর বলে অভিহিত করত, তাদের সাথে সম্পর্ক রাখতে চাইত না। খ্রিষ্টান ধর্মযাজকগণ প্রকাশ্যে হিন্দুদের মূর্তিপূজা ও সামাজিক সংস্কারাদির নিন্দা করত। ব্রিটিশরা তাদের আবাসিক স্থানে লিখে রাখত "এখানে কুকুর এবং ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ।" ব্রিটিশদের এ সকল কর্মকাণ্ডে ভারতীয়রা আহত হন এবং ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সামাজিক সংস্কার, রেলপথ, টেলিফোন আবিষ্কার, পরোক্ষভাবে ব্রিটিশের জন্য যা সৃষ্টি করা হয়েছিল তা ভারতবাসী উপলব্ধি করতে পারে।

ধর্মীয় কারণ: ইংরেজ শাসকদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের জন্য ভারতীয় হিন্দু-মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে যেমন- খ্রিষ্টান যাজকদের হিন্দু ও মুসলমানদেরকে খ্রিষ্টান ধর্মে দীক্ষিত করার চেষ্টা, ক্রিমিয়ার যুদ্ধে যোগদানের জন্য হিন্দুদের সমুদ্র পাড়ি দিতে বাধ্য করা, ভারতে খ্রিষ্টান মিশনারীদের প্রকাশ্যে খ্রিষ্টান ধর্ম প্রচার। ১৮৫০ সালের আইনের মাধ্যমে খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণকারীকে পৈত্রিক সম্পত্তিতে অধিকার প্রভৃতি ইংরেজ শাসকদের ধর্মীয় ব্যাপারে এরূপ কর্মকাণ্ডের ফলে ভারতীয়দের মনে এ আশঙ্কার জন্ম দেয় যে, ইংরেজ শাসনে তারা ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য। ফলে ভারতীয়দের মনে বিদ্রোহ দানা বাধতে থাকে।

সামরিক কারণ: ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে মহাবিদ্রোহের প্রধানতম কারণ ছিল সামরিক তথা সিপাহিদের মধ্যে অসন্তোষ। কোম্পানির অধীনে ভারতীয় সিপাহি সেনারা সর্বক্ষেত্রে নিগৃহীত ছিল। ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গ সেনার তুলনায় ভারতীয় সেনাদের বেতন ভাতা ছিল যৎ সামান্য। পদোন্নতি ছিল না, সীমাহীন আনুগত্য এবং নিষ্ঠাপূর্ণভাবে কর্তব্য কাজে প্রাণ বিপন্ন করলেও পুরস্কার বা উচ্চ পদে নিয়োগের সুযোগ ছিল না। জানা যায় ৩ লক্ষ ১৫ হাজার ৫০০ জন ভারতীয় সৈনিকের জন্য বছরে ব্যয় হতো ৯৮ লক্ষ পাউন্ড। অথচ ৫১,৩১৬ জর্ন ইউরোপীয় সেনাদের পেছনে খরচ হতো ৫৬ লক্ষ ৬০ হাজার পাউন্ড। ভারতীয় সেনাদের বিভিন্ন বিপজ্জনক যুদ্ধে সামনে ঢাল স্বরূপ ব্যবহার করত। ইউরোপীয় অফিসার ভারতীয় সেনাদের 'নিগার' কালা আদমী, শুয়ার বলে গালি দিত। খাবার-দাবার বাসস্থানেও ছিল চরম বৈষম্য।

কোম্পানির সীমাহীন বৈষম্যমূলক আচরণে দেশীয় সৈন্যদের মনকে যখন বিষাক্ত করে তোলে ঠিক তখন কয়েকটি সামরিক সংস্কারকে কেন্দ্র করে সিপাহিদের মধ্যে আগুন জ্বলে ওঠে। ১৮৫৬ সালে লর্ড ক্যানিং এক আইনের মাধ্যমে দেশীয় সিপাহিদের প্রয়োজনে দূরদেশে পাঠাবার ব্যবস্থা করেন যা হিন্দু ধর্মের উপর প্রভাব পড়ে। ১৮৫৫ সালে মহরমের মিছিলের উপর নিষেধাজ্ঞায় মুসলিম সেনারা উত্তেজিত হন। সিপাহিদের কপালে তিলক কাটা নিষিদ্ধকরণ, দাড়ি কামানো এবং প্রতীক বিশেষ চামড়ার নতুন পাঞ্জী গ্রহণে সিপাহিরা বিক্ষুদ্ধ হন।

এনফিল্ড রাইফেল ও ব্যারাকপুরে বিদ্রোহ: সিপাহিদের মধ্যে উল্লিখিত বিভিন্ন কারণে যখন অসন্তোষ পুঞ্জীভূত তখন এনফিল্ড রাইফেল নামক এক প্রকার বন্দুক ব্যবহার অশান্তির বারুদে আগুন ধরিয়ে দেয়। এই বন্দুকের বিশেষ ধরনের গুলি বা টোটা দাঁত দিয়ে ছিড়ে বন্দুকে পুরতে হতো। অনেকের ধারণা কার্তুজটিকে পিচ্ছিল রাখার জন্য এতে গরু এবং শুকরের মিশ্রিত চর্বি ব্যবহার করা হতো। এ দুটি প্রাণীর মাংস হিন্দু ও মুসলমানদের ধর্মে নিষিদ্ধ থাকায় তাদের মনে ধর্ম নাশের সন্দেহ সৃষ্টি হয়। ব্যারাকপুরের সেনাছাউনিতে মঙ্গল পাণ্ডে নামক এক সৈনিক উত্তেজিত হয়ে তার ঊর্ধ্বতন ইংরেজ অফিসারকে আক্রমণ করেন। (এ অপরাধে ২৯ মার্চ, ১৮৫৭ খ্রি. সামরিক আদালতে মঙ্গল পাণ্ডের ফাঁসি হয়)। এর পর পরই বিদ্রোহ বিভিন্ন স্থানে সিপাহিদের ছাউনিতে (উ. প্রদেশ ৯০টির মধ্যে ৭৫টিতে) দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে লাগল। এর সাথে সাধারণ মানুষ যোগ দিলে সামরিক বিদ্রোহ পরিণত হলো মহাবিদ্রোহে। হত্যাকাণ্ড, লুণ্ঠন এবং কারাগার থেকে বন্দী সিপাহিদের মুক্ত করে বিদ্রোহী সিপাহিগণ এবং দিল্লি পৌঁছে মোগল বংশের দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে সম্রাট বলে ঘোষণা করেন (১১ই মে)।

মহাবিদ্রোহ দমন

প্রথম দিকে বিদ্রোহিদের প্রচণ্ড আক্রমণে ব্রিটিশরা কোণঠাসা হলেও শেষ পর্যন্ত ইংরেজদের শক্তিবৃদ্ধি, সেনাপতিদের কর্মদক্ষতা, শিখ ও নেপালী সৈনিকদের সহযোগিতা এবং দেশীয় রাজন্যবর্গের সহযোগিতায় ইংরেজরা জয়লাভ করতে সক্ষম হয়। চার মাস অবরুদ্ধ থাকার পর স্যার জন লরেন্স দিল্লি উদ্ধার করেন। বৃদ্ধ সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে বন্দী করে রেঙ্গুনে নির্বাসনে পাঠান (বর্তমান বার্মা), তার দুই পুত্র ও পৌত্রগণকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। পাঁচ মাস যুদ্ধ করে প্রধান সেনাপতি স্যার কলিন ক্যাম্পবেল বিদ্রোহীদের পরাজিত করে লক্ষ্ণৌ উদ্ধার করেন। লক্ষ্ণৌ-এর বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন অযোধ্যার নবাবের বেগম। কানপুরের নানা সাহেব যুদ্ধ কৌশলে অনেক ইংরেজ সৈন্যকে হত্যা করলেও শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে না পেরে নেপালে পলায়ন করেন এবং সম্ভবত সেখানেই মারা যান। বিদ্রোহীদের অনেকে নেপালে আশ্রয় গ্রহণ করেন। ফলে কানপুর ইংরেজদের অধিকারে আসে। ক্যম্পবলের চেষ্টায় রোহিলাখণ্ড ব্রিটিশদের অধিকারে আসে।

লক্ষ্মীবাঈয়ের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ভারতের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ব্রিটিশদের হাতে চলে যায়। দেশপ্রেমিক আহম্মদ উল্লাহ, তাতিয়াতপি প্রমুখ ইংরেজদের হাতে শাহাদৎবরণ করেন। বিদ্রোহে ঢাকায় নিহত সৈনিকদের সমাধিস্থ করা হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে।

নিহত সৈনিকদের স্মরণের জন্যই ইংল্যান্ডের রানি ভিক্টোরিয়ার ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের শাসনভার গ্রহণের ঘোষণাপত্রটি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে বসে পাঠ করা হয়। তখন রানির নামানুযায়ী স্থানটির নাম 'ভিক্টোরিয়া পার্ক' রাখা হয়। ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে মহাবিদ্রোহের শতবার্ষিকী পালন উপলক্ষ্যে উক্ত ভিক্টোরিয়া পার্ক নাম পরিবর্তন করে শেষ মোগল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ-এর নামানুসারে 'বাহাদুর শাহ পার্ক' রাখা হয়। বর্তমানে পার্কটি ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে মহাবিদ্রোহে নিহত সৈনিকের স্মৃতি বহন করে যাচ্ছে। প্রতিদিন অনেক দর্শনার্থী এখানে বেড়াতে আসে এবং মহাবিদ্রোহের নিহত সৈনিকদের স্মৃতিচারণ করেন।

মহাবিদ্রোহের প্রকৃতি

১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে বিপ্লব ভারতের ইতিহাসে এক বড় ধরনের বিপ্লব এতে কোনো সন্দেহ নেই। এ বিপ্লবের উৎপত্তি সিপাহিদের অসন্তোষের মধ্যে থাকলেও এর পেছনে জনসাধারণের সমর্থন ও অংশগ্রহণ ছিল। এ বিপ্লব ছিল দীর্ঘ দিনের প্রস্তুতির ফল। সশস্ত্র বিদ্রোহ হিসেবে এ বিদ্রোহ আরম্ভ হলেও এর প্রকৃতি এতটাই গতিময় ও ব্যাপক ছিল যে, এটা শীঘ্রই স্বাধীনতা সংগ্রামে রূপান্তরিত হয়। দাসত্বের শৃঙ্খল হতে মুক্তিলাভের জন্য জনসাধারণ এ বিপ্লবের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছিল বিধায় এ সংগ্রামকে জাতীয় সংগ্রামও বলা যায়। কোনো কোনো দিক থেকে এই বিপ্লবকে ফরাসি বিপ্লবের (১৭৮৯) সাথে তুলনা করা যায়। ফরাসি বিপ্লব যেমন প্যারিস হতে সূচিত হয়ে সমগ্র ফ্রান্সে ছড়িয়ে পড়েছিল তেমনি সিপাহি বিদ্রোহও ব্যারাকপুর থেকে সূচিত হয়ে সমগ্র ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়েছিল। এটি ছিল মুসলিম হিন্দু নির্বিশেষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী নীতি ও অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে প্রলয়ঙ্ককরী প্রতিবাদ।

মহাবিদ্রোহে ব্যর্থতার কারণ

১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বা মহাবিদ্রোহ প্রথম দিকে সাফল্যের দিকে এগোলেও শেষ পর্যন্ত নানা কারণে এ বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়। এ ব্যর্থতার উল্লেখযোগ্য কারণগুলো নিম্নরূপ:

১। বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পরিচালিত বিদ্রোহ বিদ্রোহীদের কোনো সামগ্রিক পরিকল্পনা ও সংগঠন ছিল না। ছিল না কোনো আদর্শ ও একতা। একটি কেন্দ্র থেকে এই বিদ্রোহ পরিচালিত হয়নি। বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পরিচালিত বিদ্রোহ অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়। ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দের বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহও ব্যর্থ হয়। বিদ্রোহীদের মধ্যে বীরত্বের অভাব না থাকলেও শৃঙ্খলার যথেষ্ট অভাব ছিল।

২। অঞ্চলভিত্তিক বিদ্রোহ: বিদ্রোহ ভীষণ আকার হলেও তা ছিল অঞ্চলভিত্তিক। আঞ্চলিক সীমানা ডিঙিয়ে বিদ্রোহ বৃহত্তর পরিসরে অনুপ্রবেশ করতে পারেনি ফলে বিপ্লব ব্যর্থ হয়।

৩। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ভারতীয় সেনাবাহিনীর দক্ষতা ও অস্ত্র-শস্ত্রের তুলনায় ইংরেজ সেনাবাহিনীর দক্ষতা ও অস্ত্র-শস্ত্র শ্রেষ্ঠ ছিল। আর যারা শ্রেষ্ঠ তারা জয়লাভ করবেই এটাই স্বাভাবিক নিয়ম।

৪। জাতীয় নেতৃত্বের অভাব এটা ছিল বিদ্রোহীদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ। বিদ্রোহীদের মধ্যে উপযুক্ত নেতা বা সেনাপতি ছিল না। বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন নেতার নেতৃত্বে বিদ্রোহ পরিচালিত হয়। কারো সাথে কোনো যোগাযোগ বা যোগাযোগ রক্ষার কোনো চেষ্টা করা হয়নি। ফলে জাতীয় নেতৃত্বও গড়ে ওঠেনি, যে কারণে উক্ত বিপ্লব ব্যর্থতায় পর্যবশিত হয়।

৫। বিজিত অঞ্চলে শাসন প্রতিষ্ঠায় অক্ষম বিভিন্ন স্থানে ইংরেজ শাসন উচ্ছেদ করে কী ধরনের শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করা দরকার সে সম্পর্কে বিদ্রোহীদের কোনো ধারণা ছিল না। ইংরেজদের উচ্ছেদের পর অনেকেই মনে করেছে কাজ শেষ হয়ে গেছে। ইংরেজদের পাল্টা আক্রমণ ঠেকানোর জন্য কোনো রক্ষাকবজ তাদের ছিল না।

৬। দিল্লি পতন ও বাহাদুর শাহের বন্দী: ভারতের স্বাধীনতার প্রতীক বাহাদুর শাহ বন্দী তথা দিল্লি পতনের ফলে সিপাহী ও জনসাধারণের মনোবল ভেঙে যায়। ভারতের স্বাধীনতার প্রতীক বাহাদুর শাহ বন্দী হলে অনেকের কাছে বিদ্রোহ পরিচালনা নিস্ফল মনে হয়।

৭। ভারতের বিরাট অঞ্চল বিদ্রোহ থেকে মুক্ত পাঞ্জাব, বাংলা, মাদ্রাজ ও মুম্বাইয়ের মতো বৃহৎ অংশ বিদ্রোহ থেকে মুক্ত থাকায় ইংরেজরা সেনা ও রসদ আনার সুযোগ পায়। তাছাড়া দেশীয় অনেক রাজারা বিদ্রোহ থেকে দূরে থেকে নিজের সিংহাসন রক্ষায় মগ্ন থাকেন। যার কারণে বিদ্রোহ সফল হয়নি।

মহাবিদ্রোহের ফলাফল

১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে এ বিদ্রোহের ফলাফল ছিল অত্যন্ত সুদূর প্রসারী। নিম্নে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

১। প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম: ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের এটিই ছিল প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম।

২। স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেরণা এ আন্দোলন আধুনিক জাতীয়তাবাদের জন্ম দেয়। এ বিদ্রোহের আদর্শ, পরিকল্পনা, নেতাদের বীরত্ব, অদম্য সাহসিকতা ও দেশপ্রেম ভারতীয়দের মনে গভীর রেখাপাত করে যা পরবর্তীকালে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেরণা যুগিয়েছিল।

৩। কোম্পানি রাজত্বের অবসান এবং ব্রিটিশ সরকারের শাসনের সূত্রপাত এ আন্দোলনে ব্রিটিশ সরকার ভারত নীতি ও শাসনকার্যের ব্যাপারে বিরাট পরিবর্তন আনে। পার্লামেন্ট কর্তৃক 'ভারতের উৎকৃষ্টতর শাসনব্যবস্থা বিধান' (Act for the Better Government for India) পাশ হয়। ভারতের গভর্নর জেনারেল 'ভাইসরয়' বা রাজপ্রতিনিধি উপাধি লাভ করেন।

৪। ব্রিটিশ সরকারের রাজ্য বিস্তার নীতি পরিত্যাগ মহারানী এক ঘোষণা পত্রে বলেন, "ব্রিটিশের আর রাজ্য বিস্তার করার ইচ্ছা নেই, দেশীয় রাজাদের সঙ্গে সন্ধি রক্ষা সহ সকল সুযোগ-সুবিধা প্রদান করেন।" স্বত্ব বিলোপ নীতি চিরদিনের জন্য রহিত করা হলো।

৫। বিপ্লব এড়াতে সতর্ক: ভবিষ্যতে সিপাহী বিপ্লবের মতো বিপদ যাতে হতে না পারে তার জন্য ইউরোপীয় সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধিসহ তোপখানার ভার ইংরেজ সৈন্যদের অধীনে রাখা হলো।

৬। ভারতীয়দের প্রতি ব্রিটিশদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হলো: ব্রিটিশরা মনে করে এ আন্দোলনের জন্য মুসলমানরা দায়ী। কারণ তারা মুঘল সাম্রাজ্যের লুপ্ত গৌরব উদ্ধার করতে চেয়েছিল। সুতরাং বিপ্লব ব্যর্থ হবার পর মুসলমানদের উপর চলে ব্যাপক দমন নীতি। এই দমননীতি প্রায় ৫০ বছর স্থায়ী হয়।

৭। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ভারতবর্ষের সিপাহী, কৃষক, জনতা ও রাজন্যবর্গ ঐক্যবদ্ধ হয়েই ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে বিদ্রোহে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। যদিও সংগত কারণে বিদ্রোহ ব্যর্থ হয় তথাপিও উক্ত ঐক্য আরও মজবুত হয়। হিন্দু-মুসলমান তাদের বিদ্বেষ পরিহার করে তাদের মূল শত্রুকে চিনতে পারে। পরবর্তী যেকোনো ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে জাতীয়তাবোধ সৃষ্টিতে এ ঐক্য কাজে লাগে।

ড. আর সি মজুমদারের মতে, "একাধিক কারণে এ বিপ্লব ভারতবর্ষের ইতিহাসে একটি যুগ সন্ধিক্ষণের সূচনা করে।"

সম্পর্কিত প্রশ্ন সমূহ