- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের ফলাফল ও তাৎপর্য
১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ২৪ বছরের যুক্ত পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে যতগুলো ঘটনা ঘটেছে তার মধ্যে ১৯৬৯ সালের 'গণঅভ্যুত্থান' একটি ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এ অভ্যুত্থানে আইয়ুব খানের পতনের মধ্য দিয়ে পূর্ব বাংলার গণমানুষের বিজয় অর্জিত হয়। এ বিজয় এটা প্রমাণ করে যে পূর্ব বাংলার মানুষ পাকিস্তানিদের শাসন-শোষণ থেকে মুক্তি চায়। এ আন্দোলনের বিশেষ ফলাফল ও তাৎপর্য ছিল-
(ক) রাজবন্দিদের মুক্তি ও আগরতলা মামলা প্রত্যাহার: ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম কমিটি' (Student Action Committee-SAC) এবং গণতান্ত্রিক সংগ্রাম কমিটি (Democratic Action Committee -DAC)। SAC এর ১১ দফা এবং DAC-এর ৮ দফার ভিত্তিতে গণঅভ্যুত্থান পরিচালিত হয়। ১১ দফা ও ৮ দফার অন্যতম দাবি ছিল সকল রাজবন্দিদের মুক্তি ও আগরতলা মামলা প্রত্যাহার। এছাড়া সভা-সমাবেশে, মিছিলে-স্লোগানে গণমানুষের দাবি ছিল এটা। সুতরাং গণঅভ্যুত্থানের প্রবল জনদাবির মুখে সরকার বাধ্য হয়ে ১৯৬৯ সালের ২২ শে ফেব্রুয়ারি আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করে বঙ্গবন্ধুসহ সকল রাজবন্দিদের নিঃশর্ত মুক্তি দেয়।
(খ) গোলটেবিল বৈঠকের আহ্বান: গণঅভ্যুত্থানের চাপে পড়ে আইয়ুব খান ১৭ই ফেব্রুয়ারি রাওয়ালপিন্ডিতে গোলটেবিল বৈঠকের ঘোষণা দেন। কিন্ত তখনও শেখ মুজিবুর রহমান এর নিঃশর্ত মুক্তি ও আগরতলা মামলা প্রত্যাহার না করায় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি। অবশ্য ২২শে ফেব্রুয়ারি রাজবন্দিদের মুক্তির পর ২৬শে ফেব্রুয়ারি উক্ত গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সরকার মূলত গণআন্দোলনে নতি স্বীকার করে গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করতে বাধ্য হয়।
(গ) আইয়ুব ও মোনায়েমের পতন: ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের ফলে স্বৈরাচারী আইয়ুব খানের পতন ঘটে। ১৯৫৮ সালে এক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আইয়ুব খান জোর করে পাকিস্তানের ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং মোনায়েম খান পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক গভর্নরের পদ গ্রহণ করেন। গণআন্দোলনের মুখে ১৯৬৯ সালের ২০ শে মার্চ বাংলার দ্বিতীয় মীর জাফর নামে খ্যাত মোনায়েম খান অপসারিত হয়। ২৫ শে মার্চ আইয়ুব খান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
(ঘ) স্বৈারাচার বিরোধী মনোভাব সৃষ্টি: ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জনসাধারণের মাঝে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন জাগ্রত হয়। জেনারেল আইয়ুব খান একজন স্বৈরাচারী শাসক হলেও প্রথম দিকে তার বিরুদ্ধে তেমন কোনো আন্দোলন দানা বাঁধতে পারেনি। আইয়ুব খান তা কঠোরভাবে দমন করতে পেরেছিলেন। কিন্তু ঊনসত্তরে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে যে গণঅভ্যুত্থানের জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল সে জোয়ারে আয়ুব-মোনায়েমের গদি ভেসে যায়।
(ঙ) অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মপরিচিতি: ১৯৬৬ সালে ৬ দফা ঘোষণার মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমান গণমানুষের নেতা হয়ে উঠেছিলেন। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তিনি অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হন। এ আন্দালনে এটা প্রমাণিত হয় যে শেখ মুজিবুর রহমান গণমানুষের কত প্রিয় নেতা এবং এও প্রমাণিত হয় যে তাঁর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত আগরতলা একটি ষড়যন্ত্র মামলা। গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম একটি দাবি ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের নিঃশর্ত মুক্তি, তিনি এবং অন্যান্য রাজবন্দিরা ২২ শে ফেব্রুয়ারি নিঃশর্ত মুক্তি লাভ করেন। ২৩ শে ফেব্রুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম কমিটির (SAC) উদ্যোগে শেখ মুজিবুর রহমানকে গণসংবর্ধনা দেওয়া হয়। এ দিন প্রায় ১০ লক্ষ লোকের উপস্থিতিতে ডাকসুর তৎকালীন ভিপি তোফায়েল আহমদ শেখ মুজিবুর রহমানকে 'বঙ্গবন্ধু' (বাংলার বন্ধু) উপাধিতে ভূষিত করেন। এভাবে শেখ মুজিবুর রহমান হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধু ও গণমানুষের অবিসংবাদিত নেতা।
(চ) বাঙালি জাতীয়তাবাদের দৃঢ়করণ ও এক্যবদ্ধকরণ: বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও স্বতন্ত্র জাতিসত্তার প্রথম স্ফুরণ হয়েছিল ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। ভাষা আন্দোলনের পর থেকে বিভিন্ন আন্দোলন ও সংগ্রামের মাধ্যমে এ 'জাতীয়তাবাদ আস্তে আস্তে বিস্তার লাভ করতে থাকে। ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থান জাতীয়তাবাদ জাগ্রতর একটি চূড়ান্ত মাইলফলক। এ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে চূড়ান্ত লক্ষ্যে এগিয়ে যায়।
(ছ) ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়: ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে জাতীয়তাবাদ জাগ্রত হয়েছিল তার প্রভাবেই ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে।
(জ) স্বাধীনতার ক্ষেত্র প্রস্তুত: ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পূর্ব প্রস্তুতি। এ আন্দোলনের ফলে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর মুখোশ উন্মোচিত হয়। গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যক্ষ পরিণতি হিসেবে আইয়ুব খানের পতন হয়। আইয়ুব খানের এ পতন বাংলাদেশি স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনে অত্যন্ত তাৎপর্যবহ। গণঅভ্যুত্থানের প্রভাবেই সত্তর-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয় লাভ করে। বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা যাতে হস্তান্তর করতে না হয় সেজন্য ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা চালায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। বাঙালিরা ঝাঁপিয়ে পড়ে চূড়ান্ত স্বাধীনতা সংগ্রামে। অর্জন করে হাজার বছরের লালিত স্বপ্ন স্বাধীনতা। মূলত উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সাফল্যই জনগণকে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাঙালিদের পরিচালিত যেকোনো আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাসে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ছিল সবচেয়ে ব্যাপক ও গণসম্পৃক্ত আন্দোলন। ১৯৬৯-এর গণআন্দোলনের পথ ধরেই বীর বাঙালিরা ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটায়। অতএব, বাঙালি জাতির সংগ্রামের ইতিহাসে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান একটি তাৎপর্যবাহী ঐতিহাসিক ঘটনা।
সম্পর্কিত প্রশ্ন সমূহ

