• হোম
  • একাডেমি
  • সাধারণ
  • একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
  • পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন
পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন

পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।

Back

পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন

জাতীয় চার নেতার সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত

সৈয়দ নজরুল ইসলাম (১৯২৫-১৯৭৫) বঙ্গবন্ধুর অন্যতম বিশ্বস্ত সহকর্মী বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের জন্ম ১৯২৫ সালে ময়মনসিংহ জেলার (বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলা) যশোদলে। তাঁর মাতা নুরুন্নেসা খাতুন এবং পিতা সৈয়দ আব্দুল রহিম। তিনি ১৯৪৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্সসহ এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ঐ বছরই তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তিনি ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হলের (সলিমুল্লাহ মুসলিম হল) ভিপি নির্বাচিত হন। তিনি রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ (১৯৪৮)-এর অন্যতম সদস্য ছিলেন।

তিনি ১৯৪৯ সালে পাকিস্তান সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্ভিস পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারের আয়কর অফিসার হিসেবে যোগদান করে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৫১ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজে ইতিহাসের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৫৩ সালে 'ল' পাশ করে ময়মনসিংহ আদালতে আইন ব্যবসায় শুরু করেন। ১৯৫৭সালে ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৬৪ সালের ৮ মার্চ কাউন্সিল অধিবেশনে আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭২ সাল পর্যন্ত উক্ত পদে বহাল থাকেন। ১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবিতে দেশব্যাপী তীব্র আন্দোলন শুরু হলে আইয়ুব সরকার আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে। এ সময় সৈয়দ নজরুল ইসলাম দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। তিনি ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭০-এর নির্বাচনে ময়মনসিংহ-১৭ নির্বাচনি এলাকা থেকে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু যে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন তা বাস্তবায়ন করতে তিনি প্রাণপণ চেষ্টা করেন। ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে (শপথ গ্রহণ ১৭ই এপ্রিল) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হন রাষ্ট্রপতি এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম হন উপ-রাষ্ট্রপতি। শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে (পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি) সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। দেশ স্বাধীনের পর ২২ শে ডিসেম্বর ১৯৭১ সরকার মুজিবনগর থেকে ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। ১৯৭২ সালের ৯ই এপ্রিল আওয়ামী লীগে পার্লামেন্টারি পার্টির সহকারী নেতা নির্বাচিত হন।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট একদল বিপথগামী সৈনিকের হাতে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর দেশে সামরিক আইন জারি হয়। খোন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতি হন। এর ফলে মুজিব সরকারের পতন ঘটে এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম মন্ত্রিত্ব হারান। ২৩ শে আগস্ট তিনি গ্রেফতার হন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় অনধিকার প্রবেশকারী সশস্ত্র বাহিনীর কতিপয় ব্যক্তির হাতে ৩রা নভেম্বর ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি নির্মমভাবে নিহত হন। তার নিহতের দিন ৩রা নভেম্বর জেলহত্যা দিবস হিসেবে প্রতিবছর পালন করা হয়। তিনি জাতীয় চার নেতার অন্যতম।

তাজউদ্দীন আহমদ (১৯২৫-১৯৭৫): বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য সহকর্মী তাজউদ্দীন আহমদ ১৯২৫ সালের ২৩শে জুলাই গাজিপুর জেলার কাপাশিয়ার মধ্যবিত্ত এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মৌলবি মো. ইয়াসিন খান এবং মাতা মেহেরুননেসা খান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৬ সালে তিনি অর্থনীতিতে বিএ অনার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারি গঠিত পাকিস্তান ছাত্রলীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তাজউদ্দিন আহমদ এবং ১৯৬৪ সালে কারাগারে থেকে 'ল' পাশ করেন।

ছাত্রজীবন থেকেই তিনি প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিতে অংশ নেন। পাকিস্তান আন্দোলনে তিনি সক্রিয় অংশ নেন। তিনি 'সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ' (১৯৪৮) এবং সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ (১৯৫২) উভয় কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের দায়ে গ্রেফতার ও কারানির্যাতন ভোগ করেন। তিনি পূর্ব-পাকিস্তান যুবলীগ (এপ্রিল ১৯৫১) এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। ১৯৫৩ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং ঐ বছরই ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৪-র সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের মনোনয়নে কাপাসিয়া অঞ্চল থেকে পূর্ববঙ্গ পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৮ সালের অক্টোবর মাসে আইয়ুব খান সামরিক আইন জারির পর আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। এ সময় তাজউদ্দিন আহমদ গ্রেফতার হন এবং ১৯৫৯ সালে মুক্তি লাভকরেন। ১৯৬৪ সালের ৮ই মার্চ কাউন্সিল সভায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৬৬ সালের ৫ ও ৬ই ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলের সম্মেলনে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি সদস্য হিসেবে যোগ দেন। এ সম্মেলনেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি উত্থাপন করেন। ১৯৬৬ সালের ১৯ শে মার্চ কাউন্সিল সভায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। প্রায় ৬ বছর ধরে এই পদে থেকে বঙ্গবন্ধুর সাথে ৬ দফাসহ অন্যান্য আন্দোলনে অংশ নেন। ১৯৬৬ সালে দেশরক্ষা আইনে গ্রেফতারের পর ১৯৬৯-এ মুক্তি লাভের পর গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় অংশ নেন। ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ঢাকা-৫ আসন থেকে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনে অন্যতম পরিচালক ছিলেন তিনি।

১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করলে তিনি পালিয়ে ভারতে চলে যান। সেখানে বসে তিনি কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মুজিবনগর সরকার গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। তিনি তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির সাথে বৈঠক করেন। ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে (শপথ গ্রহণ ১৭ই এপ্রিল) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হন রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলাম হন উপ-রাষ্ট্রপতি এবং তিনি হন প্রধানমন্ত্রী। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতে তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সংগঠক। মুক্তিবাহিনীর জন্য অস্ত্র সংগ্রহ, যুদ্ধ পরিচালনা এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের ব্যাপারে তাজউদ্দিন আহমদের কৃতিত্বপূর্ণ ভূমিকা সর্বজন জ্ঞাত। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালের সংবিধান রচনায় তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৩-এর নির্বাচনে তিনি ঢাকা-২২ আসন থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এসময় ব্যাংক, বিমা, বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের ক্ষেত্রে তাঁর বলিষ্ঠ ভূমিকা রয়েছে।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট একদল বিপথগামী সৈনিকের হাতে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর দেশে সামরিক আইন জারি হয়। খোন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতি হন। এর ফলে মুজিব সরকারের পতন ঘটে। সৈয়দ নজরুল ইসলামের সাথে ২৩ শে আগস্ট ১৯৭৫ তিনি গ্রেফতার হন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী থাকা অবস্থায় অনধিকার প্রবেশকারী সশস্ত্র বাহিনীর কতিপয় ব্যক্তির হাতে ৩রা নভেম্বর ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি নির্মমভাবে নিহত হন। তার নিহতের দিন ৩রা নভেম্বর জেল হত্যা দিবস হিসেবে প্রতিবছর পালন করা হয়। তিনি জাতীয় চার নেতার অন্যতম।

ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী (১৯১৯-১৯৭৫): ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী ১৯১৯ সালের ১৬ ই জানুয়ারি সিরাজগঞ্জ জেলার কাজিপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হরফ আলী সরকার এবং মাতার নাম বেগম রওশন আরা। তিনি ১৯৪১ সালে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে বিএ এবং ১৯৪৫ সালে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ এবং 'ল'পাস করে পাবনা আদালতে আইন ব্যবসায় শুরু করেন। তিনি পাবনা আইনজীবী সমিতির নির্বাচিত সভাপতি ছিলেন। ইসলামিয়া কলেজে পড়ার সময় তিনি বঙ্গবন্ধুর সাথে পরিচিত হন। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫০ পর্যন্ত তিনি পাবনা জেলার মুসলিম লীগের সহ-সভাপতি এবং একই সাথে লীগের গার্ড বাহিনীর পাবনা জেলা শাখার ক্যাপ্টেন হন। মূলত তখন থেকেই তাঁর নামের সাথে ক্যাপ্টেন কথাটি যুক্ত হয়।

১৯৫১ সালে আওয়ামী লীগে যোগদান করে আমৃত্যু আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য পদে বহাল থাকেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে পাবনা জেলার নেতৃত্ব দেন এবং কারাভোগ করেন। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট থেকে মনোনয়ন নিয়ে পাবনা-১ আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে পূর্ববঙ্গ আইনসভার সদস্য হন। ১৯৫৬ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ-কংগ্রেস দলীয় পূর্ববঙ্গ কোয়ালিশন সরকারের মন্ত্রী নিযুক্ত হন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক আইন জারি করলে নিরাপত্তা আইনে তিনি গ্রেফতার হন এবং ১৯৫৯ সালের শেষের দিকে মুক্তি লাভ করেন। ছেষট্টির ছয় দফা আন্দোলনের তিনি ছিলেন অন্যতম রূপকার। ১৯৬৭ সালের ১২ই নভেম্বর আওয়ামী লীগের অন্যতম ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৭০-এর ১৭ই ডিসেম্বর নির্বাচনে পাবনা-১ আসন থেকে পূর্ব-পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ২৫শে মার্চের গণহত্যা ও বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতারের পর তিনি অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ভারতে গমন করেন এবং যোগাযোগ হয় অন্যান্য নেতাদের সাথে। তিনি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন। ১৯৭১ সালে ১০ই এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে (শপথ গ্রহণ ১৭ই এপ্রিল) তিনি অর্থমন্ত্রী নিযুক্ত হন। দেশ স্বাধীনের পর তিনি বঙ্গবন্ধু সরকারের অর্থ, শিল্প, প্রাকৃতিক সম্পদ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭৩ সালের ৭ই মার্চ পাবনা-১ আসন থেকে তিনি পুনরায় জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে দেশে সংসদীয় সরকারের পরিবর্তে একদলীয় রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। ২৪শে ফেব্রুয়ারি (১৯৭৫) কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠিত হলে তিনি সেক্রেটারি জেনারেল নিযুক্ত হন।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট একদল বিপথগামী সৈনিকের হাতে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর দেশে সামরিক আইন জারি হয়। খোন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতি হন। এর ফলে মুজিব সরকারের পতন ঘটে। ২৩শে আগস্ট (১৯৭৫) সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দিনের সাথে তিনি গ্রেফতার হন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় অনধিকার প্রবেশকারী সশস্ত্র বাহিনীর কতিপয় ব্যক্তির হাতে ৩রা নভেম্বর ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনিও নির্মমভাবে নিহত হন। ৩রা নভেম্বর জেলহত্যা দিবস হিসেবে প্রতিবছর পালন করা হয়। তিনি জাতীয় চার নেতার একজন। বাঙালি জাতির স্বাধিকার আন্দোলন ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠনে তাঁর অবদান স্মরণীয়।

এ.এইচ.এম.কামারুজ্জামান (১৯২৬-১৯৭৫) পুরোনাম আবুল হাসনাত মোহাম্মদ কামারুজ্জামান। জন্ম ১৯২৬ সালের ২৬শে জুন নাটোরের বাগাতিপাড়ায় বনেদি জমিদার পরিবারে। পিতা আবদুল হামিদ ও মাতা বেগম জেবুন্নিসা। ১৯৪৪ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং ১৯৪৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে অনার্সসহ স্নাতক পাস করেন। ১৯৫৬ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 'ল' পাস করেন এবং রাজশাহী জজকোর্টে আইন ব্যবসায় শুরু করেন।

ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৫৫-১৯৬৪ পর্যন্ত তিনি রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সম্পাদক ছিলেন। তিনি ১৯৬২-১৯৬৯ পর্যন্ত জাতীয় পরিষদে সম্মিলিত বিরোধী দলের সম্পাদক হন। ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলনে তাঁর অবদান অপরিসীম। ১৯৬৭-১৯৭০ পর্যন্ত নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ও ১৯৭০-১৯৭১ পর্যন্ত নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭০-এর নির্বাচনে রাজশাহী-৬ আসন থেকে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ২৫শে মার্চের গণহত্যা ও বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতারের পর তিনি শেখ ফজলুল হক মনি, তোফায়েল আহমদ ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দকে নিয়ে বগুড়া হয়ে ভারতে গমন করেন এবং যোগাযোগ করেন ভারতে অবস্থানরত অন্যান্য নেতাদের সাথে। সেখানেই মুজিবনগর সরকার গঠনের পরিকল্পনা হয়। ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে (শপথ গ্রহণ ১৭ই এপ্রিল) তিনি ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী নিযুক্ত হন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ২৩শে ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র, সাহায্য ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। ১৯৭৩-এর নির্বাচনে রাজশাহী-১০ ও রাজশাহী-১১ আসন থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৪-এর ২০শে জানুয়ারি কাউন্সিল অধিবেশনে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ১৯৭৫-এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত উক্ত পদে বহাল থাকেন। ১৯৭৫ সালে মন্ত্রিসভা পুনর্গঠিত হলে তিনি শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট একদল বিপথগামী সৈনিকের হাতে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর দেশে সামরিক আইন জারি হয়। খোন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতি হন। এর ফলে মুজিব সরকারের পতন ঘটে। কামারুজ্জামান মন্ত্রিত্ব হারান এবং গ্রেফতার হন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় অনধিকার প্রবেশকারী সশস্ত্র বাহিনীর কতিপয় ব্যক্তির হাতে ৩রা নভেম্বর ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ ও ক্যাপ্টেন এম মনসুর আহমদের সাথে তিনিও নির্মমভাবে নিহত হন। এই চার নেতার মৃত্যু দিন '৩রা নভেম্বর' জেলহত্যা দিবস হিসেবে প্রতিবছর পালন করা হয়। কামারুজ্জামান বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের স্থপতিদের একজন। বাঙালি জাতির স্বাধিকার আন্দোলন ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠনে তাঁর অবদান স্মরণীয় হয়ে আছে। (তথ্যসূত্র: বাংলা একাডেমী চরিতাভিধান)

সম্পর্কিত প্রশ্ন সমূহ