- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন
১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের সাধারণ নির্বাচন এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ
ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় এসে ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ মার্চ এক বেতার ভাষণে পরবর্তী নির্বাচন ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। এরই ধারবাহিকতায় ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের ১ জানুয়ারি থেকে সর্বপ্রকার বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করে পুনরায় রাজনৈতিক তৎপরতার অনুমতি দেওয়া হয়। পাশাপাশি ৫ অক্টোবর জাতীয় পরিষদ এবং ২২ অক্টোবর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা পিছিয়ে ৭ ডিসেম্বর এবং ১৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়।
উল্লেখ্য ১২ নভেম্বর পূর্বপাকিস্তানের কিছু অঞ্চলে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস হওয়ায় ঐ সব অঞ্চলে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
আইনগত কাঠামো আদেশ
ইয়াহিয়া খান ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ মার্চ জাতির উদ্দেশ্যে এক ভাষণে নির্বাচন সংক্রান্ত আইনগত কাঠামো আদেশ (Legal Framework Order) কাঠামোর মূলধারাগুলো ঘোষণা করেন। সেখানে তিনি মূলত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যসংখ্যা কত হবে, ভোটদানের প্রক্রিয়া কী হবে, কতদিনের মধ্যে নির্বাচিত পরিষদ সংবিধান রচনা করবে এবং পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য বিশেষ কিছু দিক তুলে ধরেন। তবে ঘোষণার বিশেষ দিকগুলো ছিল-
১। পশ্চিমপাকিস্তানে এক ইউনিট ভেঙে দিয়ে সাবেক প্রদেশগুলো পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা হবে। এগুলো ১ জুলাই, ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হবে।
২। ১৩ জন মহিলা প্রতিনিধি নিয়ে ৩১৩ আসনের জাতীয় পরিষদ হবে, আর ৬২১ জন সদস্য নিয়ে হবে পাঁচটি প্রাদেশিক পরিষদ।
৩। নির্বাচনে এক ব্যক্তি এক ভোটনীতি গ্রহণ করা হয়। পাকিস্তানে দুই অংশের আইন ও অর্থনীতি বিষয়ক দায়িত্ব ও ক্ষমতা নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নির্ধারণ করবেন।
৪। ভোটার তালিকা ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের জুনের মধ্যে তৈরি হবে।
৫। সংবিধান রচনার জন্য পরিষদের প্রথম অধিবেশন থেকে ১২০ দিনের সময় ধার্য করে দেন। এ সময়ের মধ্যে কাজ সমাধা করতে ব্যর্থ হলে পরিষদ ভেঙে নতুন নির্বাচনের কথা উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে বলা হয়, সংবিধান রচনা এবং সংবিধানকে সংজ্ঞায়িতকরণ পর্যন্ত সামরিক শাসন বহাল থাকবে। নির্বাচনের নির্দেশনাবলির পাশাপাশি সংবিধানের ভিত্তি সম্পর্কে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আইনগত কাঠামো আদেশের ২০ নং ধারায় সংবিধানে মূল ছয়টি নীতি বেঁধে দেওয়া হয়। যথা:
(ক) ফেডারেল পদ্ধতির সরকার।
(খ) ইসলামি আদর্শ হবে রাষ্ট্রের ভিত্তি।
(গ) প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটে প্রত্যক্ষ নির্বাচনে জনসংখ্যার অনুপাতে প্রতিনিধিরা নির্বাচিত হবেন।
(ঘ) মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
(ঙ) নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিভিন্ন এলাকার মধ্যকার অর্থনৈতিক ও অন্যান্য বৈষম্য দূর করতে হবে।
(চ) বিচারবিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
ইয়াহিয়া খানের আইনগত কাঠামো আদেশে মূলত সার্বভৌম পার্লামেন্টের বদলে একটি দুর্বল পার্লামেন্টের রূপরেখা দেওয়া হয়। ফলে পূর্বপাকিস্তানের রাজনৈতিক দলগুলো এর সমালোচনা করে। তারা এ আদেশের অগণতান্ত্রিক ধারাসমূহ বাদ দেওয়ার দাবি জানায়।
নির্বাচন ব্যবস্থাপনা
১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ২ জুলাই ইয়াহিয়া খানের ঘোষণা অনুযায়ী পাকিস্তানের সুপ্রিমকোর্টের বিচারক বিচারপতি আবদুস সাত্তারের নেতৃত্বে একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়। এ নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক কাজ ছিল একটি সার্বজনীন ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা। এ তালিকার মধ্যে পূর্বপাকিস্তানের ভোটার সংখ্যা ছিল ৩,১২,১৪,৯৩৫ জন এবং পশ্চিমপাকিস্তানের ২,৫২,০৬,২৬৩ জন। এ ভোটার তালিকায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী অধিবাসীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দল
১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনে আওয়ামীপন্থি দলগুলো আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করতে ইচ্ছা প্রকাশ করলেও দলীয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এককভাবে নির্বাচনের কথা ঘোষণা করেন। ফলে ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনে দলগুলো পৃথক পৃথকভাবে প্রার্থী মনোনীত করেন। এই নির্বাচনে (সারণি-১) জাতীয় পরিষদে আসন সংখ্যা ছিল ৩০০ এবং মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত ১৩টি। এর মধ্যে পূর্বপাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত হয়েছিল সাধারণ ১৬২ এবং মহিলা ৭টি। ১৬২টি আসনের জন্য দলভিত্তিক প্রার্থীসংখ্যা ছিল নিম্নরূপ:
নির্বাচনের ফলাফল
১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের ৭ ডিসেম্বর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে ১৬২টি আসনের মধ্যে ১৬০টি আসন লাভ করে। সংরক্ষিত মহিলা আসনসহ আওয়ামী লীগ মোট ১৬৭টি আসন লাভ করে জাতীয় পরিষদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। (সারণি-৩) আবার ১০ দিন পর অনুষ্ঠিত পূর্বপাকিস্তানি প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসন লাভ করে। (সারণি-৪) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
সারণি-৩: ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের সাধারণ নির্বাচনে জাতীয় পরিষদের ফলাফল:
অতএব, দেখা যাচ্ছে জাতীয় পরিষদে ৩১৩টি আসনের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন আওয়ামী লীগ লাভ করে (নৌকা প্রতীক নিয়ে)। পশ্চিম পাকিস্তানের পিপলস পার্টি ৮৮টি আসন লাভ করে। উল্লেখ্য যে, আওয়ামী লীগ পশ্চিম পাকিস্তানে এবং পিপলস পার্টি পূর্ব পাকিস্তানে কোনো আসন লাভ করেনি। ১৭ ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে ৩১০টি (মহিলা ১০) আসনের মধ্যে ২৯৮টি (২৮৮+ মহিলা ১০টি) আসন লাভ করে আওয়ামী লীগ অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করে। নির্বাচনে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে জয়লাভকরে। ১৪ জানুয়ারি ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন। কিন্তু ভুট্টো গভীর ষড়যন্ত শুরু করে। এদিকে লাহোরে ভারতীয় বিমান 'গঙ্গা' হাইজ্যাক, বিভিন্ন স্থানে বোমা বিস্ফোরণ ইত্যাদির অজুহাতে ঢাকায় অধিবেশনের পরিবেশ নেই দেখিয়ে ১লা মার্চ ১৯৭১ ইয়াহিয়া খান অকস্মাৎ ঘোষণা করলেন যে, জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত থাকবে। এ ঘোষণাতেই শুরু হয় স্বাধিকার আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্ব।
সম্পর্কিত প্রশ্ন সমূহ

