- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- ভারতবর্ষে ইউরোপীয়দের আগমন : ইংরেজ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
ভারতবর্ষে ইউরোপীয়দের আগমন : ইংরেজ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা
পলাশীর যুদ্ধের ফলাফল (The results of Battle of Palassey)
ইংরেজ কোম্পানির বণিকের মানদণ্ড শাসকের রাজদণ্ডে পরিণত করার ক্ষেত্রে পলাশীর যুদ্ধ একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এর ফলাফল ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। এ যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ভারত রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চিত্র পাল্টে যায়। নিম্নে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-
রাজনৈতিক ফলাফল :
১. নবাবের নির্মম মৃত্যু পলাশীর যুদ্ধে পরাজয়ের পর নবাব ভাগলপুরে পলায়নের পথে রাজমহন নামক স্থানে তিনি ইংরেজ সৈন্যের নিকট ধরা পড়েন। তাঁকে বন্দি অবস্থায় মুর্শিদাবাদে আনা হয়। মীর জাফরের পুত্র মিরনের নির্দেশে মোহম্মদী বেগ সিরাজকে হত্যা করে।
২. বাংলায় স্বাধীন সূর্য অস্তমিত নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের সাথে সাথে বাংলা তথা ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সূর্য প্রায় ২০০ বছরের জন্য অস্তমিত হয়ে যায়।
৩. ইংরেজদের ভারতের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ এত দিন ইংরেজ ছিল নিছক একটি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান। আর পলাশীর যুদ্ধে জয়ের ফলে ভারতবর্ষের রাজনীতিতে তারা অংশগ্রহণ করে। এ যুদ্ধে জয়ের মধ্য দিয়ে ইংরেজরা বণিকের মানদণ্ড শাসকের রাজদণ্ডে পরিণত করার প্রয়াস পান।
৪. মীরজাফর নামেমাত্র নবাব এ যুদ্ধের ফলে দেশপ্রেমিক সিরাজউদ্দৌলার স্থলে বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর পুতুল শাসকরূপে বাংলার সিংহাসনে বসেন। পূর্ব গোপন চুক্তি অনুযায়ী মীরজাফর ইংরেজদেরকে ব্যাপক বাণিজ্য সুবিধা, ক্লাইভকে ৩,৩৪,০০০ পাউন্ড ও কোম্পানিকে এক কোটি টাকা এবং ২৪ পরগনার জমিদারি প্রদান করেন।
৫. ক্লাইভের শক্তি প্রদর্শন: কুচক্রী ও ক্ষমতালোভী ক্লাইভ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে অতি সহজে ইংরেজ বাহিনীর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে এবং নবাবের বাহিনীর প্রতিরোধ ক্ষমতা ধূলিসাৎ করে দেয়।
৬. ফরাসি শক্তি বিলুপ্ত পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভের ফলে ইংরেজগণ কর্ণাটকের তৃতীয় যুদ্ধে (১৭৬৩) ফরাসিদের দাক্ষিণাত্যে পরাজিত করে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠে। পলাশীর যুদ্ধ ভারতে অবস্থানরত ফরাসিদের ভাগ্য নির্ধারণ হিসেবেও গণ্য হয়।
অর্থনৈতিক ফলাফল :
পলাশীর যুদ্ধের ফলে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার স্বাধীনতার সূর্য যেমনি অস্তমিত হয় তেমনি অর্থনীতি পাচারের দ্বারও উন্মোচিত হয়। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে জয়ের পর থেকে অষ্টাদশ শতক ধরে কোম্পানি এবং তার কর্মচারীরা বাংলা তথা উপমহাদেশের সম্পদ যেভাবে অপহরণ, লুণ্ঠন ও পাচার করেছে তাকে পলাশীর লুণ্ঠন বলা হয়েছে। পলাশীর লুণ্ঠন (Plassey plunder) কথাটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন ব্রুকস অ্যাডামস (Brooks Adams) নামে এক গবেষক।
পলাশীর যুদ্ধে জয়ের পর কোম্পানি মীর জাফরের সাথে পূর্ব চুক্তি মোতাবেক নগদ এবং কিস্তিতে প্রচুর অর্থ-সম্পত্তির অধিকারী হয়। শুধু তাই নয় তারা ব্যবসায়-বাণিজ্যে অবাধ স্বাধীনতা লাভ করে, কোম্পানি বিনা শুল্কে বা নামেমাত্র শুল্কে বাংলার সর্বত্র একচেটিয়া বাণিজ্য করতে থাকে, এতে দেশীয় বণিকদের সমাধি রচিত হয়। কোম্পানির পাশাপাশি কর্মচারীরা নামে, বেনামে বাণিজ্য, উৎকোচ, উপঢৌকন গ্রহণ করে অজস্র পরিমাণ অর্থ ও সম্পদ ইংল্যান্ডে পাঠাতে থাকে। এতে ইংল্যান্ড সমৃদ্ধশালী হয়ে ওঠে এবং উপমহাদেশ নিঃস্ব হয়ে যায়।
ইংরেজরা পলাশীর যুদ্ধে জয়ের পর যেভাবে অর্থ সংগ্রহ করেছে তাকে অর্থ উপার্জন না বলে অর্থ অপহরণ বলাই যুক্তিযুক্ত। অর্থ অপহরণের পথপ্রদর্শক ছিলেন রবার্ট ক্লাইভ। "ক্লাইভ এবং তাঁর অনুসারীরা যত তাড়াতাড়ি পার অর্থ সংগ্রহ কর এবং স্বদেশে ফিরে যাও"- এই নীতি গ্রহণ করেছিলেন। মীর জাফরের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ যখন শেষ হয় তখন তারা মীর কাশিমকে বাংলার মসনদে বসিয়ে নতুন করে অর্থ সংগ্রহ শুরু করে। মীর কাসিমকে মসনদে বসানো বাবদ ৩২,৭৮,০০০ টাকা কোম্পানি হাতিয়ে নেয়। ১৭৬৫ সালে মীর জাফরের মৃত্যুর পর তার নাবালক পুত্র নজমউদ্দৌলাকে মসনদে বসিয়ে ৬২,৫০,০০০ টাকা এবং নাজিম পদে রেজখানকে বসিয়ে কোম্পানির সদস্যরা ৪,৭৬,০০০ টাকা উৎকোচ গ্রহণ করেন। এ সময় তারা বাংলার দেওয়ানি লাভ করে অর্থ সংগ্রহের চূড়ান্ত পর্যায় পৌঁছায়। চৌৎসিংহ অযোধ্যার নবাব প্রভৃতির নিকট থেকে প্রচুর অর্থ আত্মসাৎ করে।
কোম্পানি এবং কোম্পানির কর্মচারীরা ভারতবর্ষ থেকে কী পরিমাণ অর্থ সম্পদ অপহরণ করেছেন তার সঠিক হিসাব মেলানো কঠিন। তবে কোম্পানির কর্মচারীদের ইংল্যান্ডে বিলাসবহুল জীবনযাপন দেখে তাদেরকে ভারতীয় নবাব বলে ডাকা হতো। কোম্পানির ভারতীয় বাণিজ্য সম্পর্কে কার্ল মার্কস বলেছেন, "এক সিলিং খরচ না করে এই সকল ব্যক্তিরা (কোম্পানির কর্মচারী) শূন্য থেকে সোনা বানাত। তারা মাছের তেলে মাছ ভাজত।" সুতরাং পলাশীর যুদ্ধের অর্থনৈতিক ফলাফল উপমহাদেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতিকর।
সম্পর্কিত প্রশ্ন সমূহ

