• হোম
  • একাডেমি
  • সাধারণ
  • একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
  • ভারতবর্ষে ইউরোপীয়দের আগমন : ইংরেজ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা
ভারতবর্ষে ইউরোপীয়দের আগমন : ইংরেজ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা

পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।

Back

ভারতবর্ষে ইউরোপীয়দের আগমন : ইংরেজ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা

ইংরেজ কোম্পানির দ্বৈতশাসন The Dual Government of the English Company

দিল্লির সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের নিকট থেকে দেওয়ানি লাভ এবং বাংলার নবাবকে বাৎসরিক ৫৩ লক্ষ টাকার বৃত্তিভোগীতে পরিণত করে লর্ড ক্লাইভ বাংলায় যে অদ্ভুত শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন তাই ইতিহাসে দ্বৈতশাসন (Dual Governments) নামে পরিচিত।

প্রকৃতপক্ষে অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলার নিকট থেকে প্রাপ্ত কারা ও এলাহাবাদ জেলা এবং বার্ষিক ২৫ লক্ষ টাকার বিনিময়ে দিল্লির সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের নিকট থেকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভের পরিণতিই ছিল দ্বৈত শাসন। মীরজাফরের মৃত্যুর পর তার নাবালক পুত্র নজিমউদ্দৌলা নামে মাত্র সিংহাসনে থাকেন। রাজস্ব ক্ষমতা কোম্পানি দখল করে। কিন্তু শাসন সংক্রান্ত দায়িত্ব নবাবের হস্তে ন্যস্ত করে। কোম্পানি রাজস্বের অধিকার স্ব-হস্তে রেখে তা আদায়ের ভার দেশীয় দুজন কর্মচারী সিতাব রায় এবং রেজা খানের ওপর ছেড়ে দেয়। এর কারণ ছিল কোম্পানির প্রকৃত ক্ষমতা গোপন করা এবং রাজস্ব সম্পর্কে তাদের যথেষ্ট জ্ঞান বা লোকবল না থাকা। অতএব দেখা যায়, এই বিভক্তির ফলে নবাব পেল শাসন সংক্রান্ত বিষয়সমূহ এবং কোম্পানি পেল রাজস্বের অধিকার। অর্থাৎ নবাব পেল ক্ষমতাহীন দায়িত্ব এবং কোম্পানি পেল দায়িত্বহীন ক্ষমতা। প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ক্ষমতা ও দায়িত্বের বিভক্তিকরণের এই অদ্ভুত ব্যবস্থাই ইতিহাসে দ্বৈতশাসন নামে পরিচিত।

দ্বৈতশাসনের ফলাফল

লর্ড ক্লাইভ প্রবর্তিত দ্বৈতশাসন ব্যবস্থায় কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণই ছিল বেশি। এ নীতিতে ইংরেজ কর্মচারীদের অত্যাচার, উৎপীড়ন ও শোষণের ফলে বাংলার জনসাধারণের অর্থনৈতিক অবস্থা ক্রমেই শোচনীয় হয়ে পড়ে। বাংলার অর্থনৈতিক দুরবস্থা লক্ষ করে ঐতিহাসিক মেকেল বলেন, এরূপ নিষ্ঠুর শোষণ ও উৎপীড়ন বাংলার মানুষ কোনো দিন দেখেনি। এ নীতিতে রাজ্য শাসনের ব্যাপারে নবাবকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও তাঁকে কোনো ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। অপরদিকে কোম্পানি লাভ করে দায়িত্বহীন ক্ষমতা যার কোনো জবাবদিহিতা ছিল না। এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক র‍্যামসে ম্যুর (Ramsay Muir) বলেন, "প্রথম থেকেই দ্বৈতশাসনের ব্যর্থতা ছিল সুনিশ্চিত।"

দ্বৈতশাসনের ফলে বাণিজ্য, কৃষি ও শিল্পের অবনতি ঘটে। বাংলার স্বাধীন নবাবি আমলে বহু বিদেশি ব্যবসায়ী ও পুঁজিপতি এদেশের পণ্য কিনত কিন্তু কোম্পানির দ্বৈতশাসন নীতির ফলে তাদের একচেটিয়া প্রাধান্য ব্যবসায় ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ীরা বাণিজ্যে মার খায় এবং দেশের রপ্তানি আয় নিম্ন পর্যায়ে পৌঁছে।

দ্বৈতশাসন ব্যবস্থায় বাংলার লর্ড ক্লাইভ কর্তৃক প্রবর্তিত বাংলার সামাজিক, অর্থনৈতিক, শান্তি-সমৃদ্ধি ধ্বংস করে দেয়। নবাবের হাতে কোনো ক্ষমতা না থাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। গ্রাম বাংলায় চোর, ডাকাত, লুটেরা আধিপত্য বিস্তার করে। ফলে গ্রাম শূন্য হয়ে যায়। কোম্পানির লোকেরা ইচ্ছামতো রাজস্ব আদায় করত, অত্যাচার করত। ফলে বাংলার মানুষ দরিদ্র ও অসহায় হয়ে পড়ে। কৃষি ও শিল্পের অবনতি ঘটে। দেশের রপ্তানি আয় সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়। ইংল্যান্ডে অর্থ পাঠানো বৃদ্ধি পায়। পূর্বে যে পূর্ণিয়া জেলা থেকে বার্ষিক চার লক্ষ টাকা আদায় করা হতো দ্বৈতশাসনের ফলে সেখান থেকে ২৫ লক্ষ টাকা আদায় করা হতো। অধিক রাজস্ব আদায়ের ওপর দু বছর অনাবৃষ্টির ফলে বাংলায় এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ নেমে আসে।

দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা কোম্পানির জন্য কিছু সুফল বয়ে আনলেও এর কুফল ছিল ভয়াবহ। শাসনকার্য পরিচালনার জন্য নবাবকে কোম্পানির দয়ার ওপর নির্ভর করতে হতো। অর্থাভাব এবং ক্ষমতার অভাবে প্রশাসনিক আইন-শৃঙ্খলা দ্রুত ভেঙে পড়ে। অন্যদিকে, কোম্পানির ক্ষমতা বলে রেজাখান ও সিতাব রায়ের রাজস্ব আদায়ের ব্যাপারে অত্যাচারের সীমা ছাড়িয়ে যায়। শাসন ও ক্ষমতার দোটানায় পড়ে জনসাধারণের দুঃখ-কষ্টের অন্ত ছিল না। দ্বৈতশাসনের চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১৭৭০)। ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১৭৭০) গভর্নর কার্টিয়ারের শাসনকালে ইংরেজি ১৭৭০ এবং বাংলা ১১৭৬ সালে বাংলা ও বিহারে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এই দুর্ভিক্ষে বঙ্গদেশে এক-তৃতীয়াংশ লোক মৃত্যুবরণ করে, যা ইতিহাসে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে পরিচিত। ১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভ ও দ্বৈতশাসন প্রবর্তনের চরম পরিণতিই ছিল ছিয়াত্তরের মন্বন্তর। ঐতিহাসিক হান্টারের বিবরণ থেকে জানা যায়, পর পর দু'বছর (১৭৬৮ ও ১৭৬৯ খ্রি.) অনাবৃষ্টির পর কোম্পানির রাজস্ব আদায়ের জুলুমে সর্বস্বান্ত হয়ে কৃষক তার গরু লাঙল বেচে ফেলে, বীজধান খেয়ে ফেলে। শেষ পর্যন্ত পুত্র, কন্যাকে বিক্রি করতে আরম্ভ করে। গাছের পাতা, ঘাস প্রভৃতিও তারা খেতে শুরু করে। একই সঙ্গে আরম্ভ হয় মারাত্মক গুটি বসন্তের (ইংল্যান্ডের Black Death-এর মতো) মহামারি। দলে দলে মানুষ পথে-ঘাটে মৃত্যুবরণ করে। মাংসভোজী পশু-পাখিদের মানুষের মাংসে অরুচি দেখা দেয়। গ্রামগুলো মৃত্যুপুরিতে পরিণত হয়। এই ভয়ঙ্কর সর্বনাশা মন্বন্তরে বঙ্গদেশের ৩ কোটি লোকের মধ্যে ১ কোটি লোক মৃত্যুবরণ করে।

এই মন্বন্তরের ফলাফল ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। এই মন্বন্তরের ফলে গ্রামগুলো জনশূন্য শ্মশানে পরিণত হয়, জমিগুলো অনাবাদি হয়ে থাকে এবং জমিদারি 'নাজাই প্রথার' প্রকোপ বৃদ্ধি পায়। পরোক্ষ ফল হিসেবে দ্বৈতশাসনের অবসান ঘটে এবং ১৭৭৩ সালে রেগুলেটিং এ্যাক্ট প্রবর্তন হয়।

সম্পর্কিত প্রশ্ন সমূহ